Image description

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী আপাতত প্রত্যাহার করা হবে না। একই সঙ্গে তেহরান ওয়াশিংটনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ‘অভূতপূর্ব’ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

এতে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

 

বুধবার (৮ এপ্রিল) গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা ‘বাস্তব চুক্তি’ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান ও তার আশপাশের এলাকায় অবস্থান করবে।

একই পোস্টে আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, যদি কোনো কারণে তা বাস্তবায়িত না হয়… তাহলে ‘গুলি শুরু হবে’, যা হবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, শক্তিশালী এবং ভয়াবহ।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির একদিন পর।

ছয় সপ্তাহের সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা সাময়িকভাবে বৈশ্বিক বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমে আসে।

 

তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি সেই স্বস্তিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তাদের মতে, ট্রাম্পের কথার কোনো ঠিক নেই। ফলে এই যুদ্ধবিরতি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো দাবিগুলো পুনর্ব্যক্ত করেছেন। 

ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে আসতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প। তিনি এও বলেছেন, মার্কিন বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার এটিও উল্লেখ করেছেন, তারা বিশ্রাম করছে কিন্তু পরবর্তী অভিযানের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার ইরানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম আইএসএনএ ও তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি চার্ট প্রকাশ করে। এতে দাবি করা হয়, যুদ্ধ চলাকালে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) 
হরমুজ প্রণালীতে নৌ-মাইন স্থাপন করেছিল।

চার্টটিতে ফারসি ভাষায় ‘বিপজ্জনক এলাকা’ চিহ্নিত একটি বড় বৃত্ত দেখানো হয়, যা জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত পথ—ট্রাফিক সেপারেশন স্কিমের ওপর অবস্থিত। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, জাহাজগুলোকে প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলার সময় আরও উত্তরে, ইরানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি লারাক দ্বীপ সংলগ্ন জলপথ ব্যবহার করতে হতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে কিছু জাহাজকে এই বিকল্প পথ ব্যবহার করতেও দেখা গেছে।

চার্টটির সময়সীমা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। তবে এরপর ওই রুটে স্থাপিত মাইন অপসারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থই নেই’
ইরানের মাটিতে বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে সন্দেহ আর অনিশ্চয়তাই প্রধান সুর। তেহরানের অনেক বাসিন্দা প্রশ্ন তুলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি আর অঞ্চলে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের ছায়ায় কূটনীতি আদৌ টিকে থাকতে পারে কি না। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক নারী বলেন, একটা দিনও যদি হত্যা আর রক্তপাত ছাড়া কাটে, সেটাই আমাদের জন্য অনেক বড় বিষয়। এতে আমরা খুশি হব। আল্লাহর কসম, এত হত্যাকাণ্ড দেখে আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে নিজের ঘরেও থাকতে পারিনি।

আরেকজন পুরুষ সরাসরি এই যুদ্ধবিরতিকে অগ্রাহ্য করেন। তিনি বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার দিকে তাকাতেই হবে। আমাদের শহীদ নেতাকে এখনো দাফনই করা হয়নি, আর যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন চলছেই। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থই নেই।

তৃতীয় এক বাসিন্দা আরও স্পষ্ট করে বলেন, এটা পুরোই ট্রাম্পের সাজানো নাটক। এই যুদ্ধবিরতিতে আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই।

সব মিলিয়ে, ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতিকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে নানা দ্বন্দ্ব আর প্রশ্ন রয়ে গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বিস্তৃত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর বদলে তারা নিজেদের শর্ত তুলে ধরে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। তবে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত এসব শর্তে সম্মতি দেয়নি।

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা
অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে।

পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদাম বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য একটি প্রতিনিধি দল আজ রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছাবে। তবে কিছুক্ষণ পর তিনি সেই পোস্ট মুছে ফেলেন।

এদিকে এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বুধবার হঠাৎ করেই ইসলামাবাদে দুই দিনের স্থানীয় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ, যদিও এর কোনো কারণ জানানো হয়নি। এতে সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে জল্পনা আরও জোরদার হয়েছে। 

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে ইসরায়েল। ইরানে সরাসরি হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করলেও, লেবাননে তারা হামলা আরও জোরদার করেছে। ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিযানে একদিনেই অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

অর্থাৎ, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং দ্বন্দ্বপূর্ণ রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির আরও অবনতিতে তেহরান থেকে সতর্কবার্তা এসেছে, এমন অবস্থায় আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ‘অযৌক্তিক’ হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী চাপ বাড়ছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকার জানিয়েছেন, কংগ্রেসে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’র আওতায় ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনহীন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বুকার বলেন, ট্রাম্পের অনুমোদনহীন সামরিক অভিযান এবং বেপরোয়া যুদ্ধ উসকানি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধ চায় না, এমনকি এর অনুমোদনও দেয়নি। তবুও তাদেরই এর মূল্য দিতে হচ্ছে।

এ সব কিছুই ইঙ্গিত দেয়, একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ ও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।