ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংসের হুংকার দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো ইউটার্ন নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানকে বেঁধে দেয়া সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হয়েছে। শান্তির বাতাস কতক্ষণ বইবে তা নিয়ে শংকা থাকলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি আকস্মিক মনে হলেও এর অন্তরালে ঘটছে বেশ কিছু ঘটনা। ট্রাম্প যখন ইরানের ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, তার কয়েক ঘণ্টা আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। বেশ কয়েকটি দেশের কর্মকর্তারা সমঝোতা এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় একটানা ব্যস্ত ছিলেন। ইরানের তরফ থেকেও ছিল ইতিবাচক সাড়া।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম অ্যাক্সিওস এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে সমঝোতার অন্তরালের কিছু ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনের সংক্ষেপিত ভাষান্তর করেছেন সঞ্জয় দে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আল্টিমেটাম সামনে ঘনিয়ে আসার প্রায় দুই দিন আগে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা চমকপ্রদ এক অগ্রগতির তথ্য জানতে পারেন।
ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো অবশ্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত কী ঘটতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকান বাহিনী এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে ইরানের অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ইরানের নজিরবিহীন প্রতিশোধের আশংকায় প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অন্যদিকে ইরানের ভেতরের অনেক সাধারণ মানুষ হামলার মূল আঘাত এড়াতে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে।
তবে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শেষপর্যন্ত ভয়াবহ সংকট এড়ানোর পথ সাময়িকভাবে খুলে দেয়। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১১টি সূত্র তুলে ধরেছে অন্তরালের সেই বিবরণ।
হোয়াইট হাউসে সোমবার সকালে ট্রাম্প যখন ইস্টার উদযাপনের বিষয়ে জনতাকে আকৃষ্ট করছিলেন, ঠিক তখন মধ্যপ্রাচ্যে তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ব্যস্ত টেলিফোনে। ইরানের তরফ থেকে আসা প্রস্তাব নিয়ে তার কণ্ঠে ‘ক্ষোভের আগুন’।
উইটকফ মধ্যস্থতাকারীদের জানান, ইরান থেকে সদ্য পাওয়া পাল্টা ১০ দফা প্রস্তাবটি ‘প্রচণ্ড হতাশাজনক এবং ভয়াবহ।’
এরপর শুরু হয় প্রস্তাব সংশোধনের ‘বিশৃঙ্খল’ একটি দিন। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে নতুন খসড়া আদান-প্রদান শুরু করেন। মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও বিভাজন কমিয়ে আনার চেষ্টা চালান।
মধ্যস্থতাকারীরা সোমবার রাত নাগাদ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির একটি হালনাগাদ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পান। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় মোজতবা খামেনির ওপর। ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা সোম ও মঙ্গলবার সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার সম্পৃক্ততা ছিল গোপনীয় ও বিচ্ছিন্নতায় পরিপূর্ণ। ইসরায়েলের হত্যার হুমকির মুখে থাকায় তিনি মূলত বার্তাবাহকের মাধ্যমে নোট পাঠিয়ে নিজের আলোচক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। খামেনির পক্ষ থেকে আলোচকদের চুক্তিতে পৌঁছানোর অনুমোদনের বিষয়টিকে ‘একটি ব্রেকথ্রু’ হিসেবে বর্ণনা করেছে দুটি সূত্র।
আঞ্চলিক এক সূত্র জানায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডারদের চুক্তি মেনে নিতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই সঙ্গে চীনও ইরানকে উত্তরণের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেয়।
তবে সোমবার ও মঙ্গলবারের সব বড় সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মোজতবা খামেনির মাধ্যমে হয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রটি বলেছে, ‘তার সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো চুক্তি হওয়া সম্ভব ছিল না।’
আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়টি মঙ্গলবার সকাল নাগাদ স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে এর মধ্যেই ট্রাম্প তার সবচেয়ে ভয়াবহ হুংকার দিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংবাদমাধ্যম জানায়, ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান আলোচনা থেকে সরে গেছে। তবে আলোচনায় যুক্ত সূত্রগুলো অ্যাক্সিওসকে জানায়, বিষয়টি ঠিক নয়, বরং সমঝোতার পথে গতি আরো বাড়ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি থেকে ফোনে প্রধানত পাকিস্তানিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সারাদিন ট্রাম্প ও তার দলের সঙ্গে টানা কথা বলেন। প্রক্রিয়ার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে কি না—তা নিয়ে ইসরায়েলিদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছিল।
ইস্টার্ন টাইম মঙ্গলবার দুপুরের দিকে (বাংলাদেশে মঙ্গলবার রাত) একটি সাধারণ ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটি হলো বিবদমান পক্ষগুলো দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির দিকে এগোচ্ছে। তিন ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে শর্তগুলো প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে গ্রহণের আহ্বান জানান।
এরপরই ট্রাম্প তার কট্টরপন্থী মিত্র ও ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে ফোন ও বার্তা পেতে শুরু করেন। তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জোরাল আহ্বান জানান।
এমন অবস্থায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলেও প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও তার সঙ্গে কথা বলা অনেকের ধারণা ছিল, ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে সম্ভবত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন। তবে বাস্তবে সেটি ঘটেনি।
ট্রুথ সোশ্যালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলে চুক্তি চূড়ান্ত করেন।
ট্রাম্পের পোস্টের ১৫ মিনিট পর আমেরিকান বাহিনীকে হামলা স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর আরাঘচি ঘোষণা করেন, ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন’ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেবে।
এখন দেখার বিষয়, ইরান হরমুজ প্রণালিতে কত জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয়। আবার নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি মানতে কতটা আগ্রহী হবেন সেটিও দেখার বাকি।
জ্যেষ্ঠ এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, নেতানিয়াহুকে কিছু আশ্বাস দেয়া হয়েছে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় জোর দিয়ে বলবে—ইরানকে তার পারমাণু উপাদান ত্যাগ করতে হবে। এগুলো সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করতে হবে।
চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ধারণার মধ্যে এখনও বড় ফারাক রয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যেখানে তারা ট্রাম্পের ইরান ধ্বংসের হুমকির সমালোচনাকারীদের কঠোর জবাব দিতে পারেন। তারা যুক্তি দেবেন, ট্রাম্পের হুমকির কারণেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানি সরকার ঠিক উল্টো যুক্তি দিয়ে আসছে। তারা হয়ত ভাবছে—ট্রাম্পের হুমকি আদৌ পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি না।