ইহুদি বিদ্বেষী ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর পর এবার বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহর সিডনিতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিতর্কের মুখে তিনি আগেই অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করেন। তার দেশ ছাড়ার পরই ভিসা বাতিলের খবরটি নিশ্চিত করেছে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টেলিগ্রাফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (৬ এপ্রিল) ক্যানবেরা, শুক্রবার অ্যাডিলেড এবং শনিবার পার্থে শায়খ আহমাদুল্লাহর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। ভিসা বাতিল হওয়ায় এই সফরগুলো স্থগিত করা হয়েছে।
টেলিগ্রাফের দাবি অনুযায়ী, শায়খ আহমাদুল্লাহ ইহুদিদের ‘ঘৃণ্য’ এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির কারিগর হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। একটি ভিডিওর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি এক আলোচনায় বলেছিলেন, ‘জনৈক পণ্ডিত বলেছিলেন... এমনকি দুটি মাছ যদি লড়াই করে, তবে বুঝতে হবে এর পেছনে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র আছে। তারা এমনই ঘৃণ্য... বিশ্বের সব অস্থিরতার পেছনে তারাই কলকাঠি নাড়ে।’
রবিবার অস্ট্রেলিয়ার সহকারী অভিবাসন মন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েট জানান, তিনি শায়খ আহমাদুল্লাহর বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন। স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, “আমরা এমন ব্যক্তিদের মোটেও সহ্য করব না যারা ইহুদি বিদ্বেষী বা ইসলামভীতি ছড়ায়। অভিবাসন আইনে আমাদের ভিসা বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে।”
শায়খ আহমাদুল্লাহর আগে গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে মিজানুর রহমান আজহারীকে অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজহারী নাৎসি স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলারকে ইহুদিদের জন্য ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
এছাড়া তিনি ইহুদিদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী’, ‘বিষাক্ত কলঙ্ক’ এবং এইডসের মতো রোগের জন্য দায়ী করেছিলেন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি হলোকাস্টের প্রশংসা করেন এবং ইহুদিদের ‘মানবেতর’ হিসেবে তুলে ধরেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজহারীর সফরের মাঝপথেই তার ভিসা বাতিল করে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ শীর্ষক সিরিজে অংশ নিতে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরায় তার সফরের কথা ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডানিয়াম এবং জোট সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র মিকায়েলিয়া ক্যাশ এই দুই বক্তাকে ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। মিকায়েলিয়া ক্যাশ বলেন, “অস্ট্রেলিয়া একটি পশ্চিমা দেশ এবং এর নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে। আপনি যদি এখানে ঘৃণা ছড়াতে এবং আমাদের মূল্যবোধ নষ্ট করতে আসেন, তবে আপনাকে কখনোই প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার কেবল বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই ব্যবস্থা নিয়েছে।
এর আগে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিস ইন বাংলাদেশ দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে আজহারীর বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। তারা সতর্ক করেছিল যে, আজহারীর বক্তব্য ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। সফরের আয়োজক সংস্থা ‘ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল’-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১ মার্চ) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার ভিসা বাতিল হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন আজহারী নিজেই। যদিও এ খবরকে ঘিরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ হয়েছে বলে দাবি তার।
এই ইসলামি বক্তার দাবি, একটি মহল অস্ট্রেলিয়া সরকারের এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়েছে। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
ওই পোস্টে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে বক্তাদের সফর ঘিরে চাপ বা প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয়; আমার ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছে। কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহল ও নাস্তিক্যবাদী পক্ষ পরিকল্পিতভাবে একজোট হয়ে পুরোনো, বিচ্ছিন্ন বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটহীনভাবে তুলে এনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে।’