নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচলিত ভূরাজনৈতিক ধারণা ছিল যে বিশ্বব্যবস্থা তিনটি শক্তিকেন্দ্রের দিকে এগোচ্ছে। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া। এই ধারণা অনুযায়ী, শক্তির মূল উৎস ছিল অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামরিক শক্তি। কিন্তু এখন সেই ধারণা আর পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। দ্রুতই একটি চতুর্থ বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র আবির্ভূত হচ্ছে। সেটা হলো ইরান। এ দেশটি অর্থনীতি বা সামরিক শক্তিতে এই তিন দেশের সমকক্ষ না হলেও, নতুন এক উৎস থেকে শক্তি অর্জন করছে। সেই উৎস হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ। এই প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। সেখানে সব দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারত। কিন্তু এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার পর, ইরান সেখানে আংশিক সামরিক অবরোধ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। স্বল্পমেয়াদে এর বিকল্প কোনো বাস্তব পথ নেই। যদি ইরান মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, যা আমার মতে সম্ভব, তাহলে এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেবে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হবে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ সাময়িক। তাদের ধারণা, শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নৌবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে এবং তেলের সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এই ধারণা ভুল। এটি ধরে নেয়া হয় যে প্রণালিটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ইরানকে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ না করেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমানে ট্যাংকার চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজ বা ট্যাংকার চলাচল ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এর কারণ ইরান প্রতিটি জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছে না, বরং হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকির কারণে বীমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধঝুঁকি কভারেজ তুলে নিয়েছে বা মূল্য বাড়িয়েছে। কয়েক দিন পরপর একটি কার্গো জাহাজে হামলাই ঝুঁকিকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যথেষ্ট।
আধুনিক অর্থনীতি শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সময়মতো, নির্ভরযোগ্যভাবে এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে তেল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
যখন এই নির্ভরযোগ্যতা ভেঙে পড়ে, তখন বীমা বাজার সংকুচিত হয়, পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং সরকারগুলো জ্বালানি সরবরাহকে সাধারণ বাজার লেনদেনের বদলে একটি জটিল কৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যাটি হলো অসমতা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রতিটি তেলবাহী জাহাজকে সম্ভাব্য হামলা মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করা একটি পূর্ণ সময়ের কাজ। এর জন্য স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি দরকার। কিন্তু ইরানের জন্য মাঝে মাঝে একটি ট্যাংকারে হামলা করাই যথেষ্ট, যাতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রন বৃহস্পতিবার বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলা ‘বাস্তবসম্মত নয়’ এবং ‘এটি কেবল ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।’ এতে বোঝা যায়, ইরানের সম্মতি ছাড়া তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দশকের পর দশক পারস্য উপসাগরে একটি সহজ সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল। তেল উৎপাদনকারীরা রপ্তানি করবে, বাজার দাম নির্ধারণ করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র রুট নিরাপদ রাখবে। এই ব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল। এখন তা ভেঙে পড়ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো রাষ্ট্রীয় আয়ের জন্য ব্যাপকভাবে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। যখন বীমার খরচ বেড়ে যায় এবং পরিবহন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে পড়ে। সরকারগুলো নীতিতে পরিবর্তন আনে, পণ্য পরিবহনের পথ বদলায়, নতুন চুক্তি করে।
যদি এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উপসাগরীয় ব্যবস্থাও বদলে যাবে। এমন একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে দেশগুলো সেই শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করবে, যে তাদের রপ্তানির নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে। আর সেই শক্তি এখন ইরান। এর বৈশ্বিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশিয়ায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত উপসাগরী অঞ্চল জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীনও অনেকাংশে এই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতা এমন অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত যেমন রিফাইনারি, জাহাজ চলাচলের পথ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যা দ্রুত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
যদি জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব ব্যাপক হবে। বীমা ও পরিবহন খরচ বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়বে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, মুদ্রার মান কমবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। জ্বালানির ওপর নির্ভরতা নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। সরকারগুলো জ্বালানির প্রবেশাধিকারকে অগ্রাধিকার দেবে, কূটনৈতিক বিকল্প কমে যাবে এবং অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এমন পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ১৯৭০-এর দশকের মতো তেল সংকট থেকে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা (স্ট্যাগফ্লেশন) আবার বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ইরান।
চীন তার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া উচ্চ ও অস্থির জ্বালানির দাম থেকে লাভবান হয়। আর ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রভাব বাড়ায়। এই তিনটি দেশের প্রণোদনা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিপরীতে কাজ করে। তাদের আনুষ্ঠানিক জোট করার প্রয়োজন নেই- পরিস্থিতিই তাদেরকে একই দিকে ঠেলে দেয়। এভাবেই নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠে- প্রথমে আনুষ্ঠানিক জোট ছাড়াই, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিত স্বার্থের মাধ্যমে।আরও অন্ধকার ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও রয়েছে। কল্পনা করুন, ইরানের নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের শতকরা প্রায় ২০ ভাগ তেল, রাশিয়ার ১১ ভাগ, আর চীন সেই সরবরাহের বড় অংশ গ্রহণ করছে। তারা মিলে একটি কার্টেল তৈরি করতে পারে, যা পশ্চিমা দেশগুলোকে বিশ্বের ৩০ ভাগ তেল থেকে বঞ্চিত করবে। এর ফল হবে ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্ষমতা দ্রুত কমে যাবে, আর চীন, রাশিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়বে বৈশ্বিক শক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে: হয় দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে, নয়তো এমন একটি নতুন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে মেনে নিতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আর নিশ্চিত নয়।
যদি যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়, তাহলে ফল পরিষ্কার- আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইরান চতুর্থ শক্তিকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথ বেছে নেয়, তাহলে তা হবে দীর্ঘ ও কঠিন যুদ্ধ, যেখানে পরাজয়ের ঝুঁকিও রয়েছে।
এই ইরান যুদ্ধ এমন কোনো সংঘাত নয়, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই বেরিয়ে এসে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। নতুন সমঝোতায় ইরান নিশ্চয়ই বড় মূল্য দাবি করবে। কিন্তু সেটি ভবিষ্যতের বিকল্প পরিস্থিতির তুলনায় কম ব্যয়বহুল হতে পারে। এটি একটি রূপান্তরমূলক যুদ্ধ এবং যদি এই পরিবর্তন কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক ব্যবস্থা অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে যাবে।
(লেখক শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি সামরিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করেন। তার এ লেখাটি প্রভাবশালী নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ)