ঐতিহাসিক লুনার ফ্লাইবাই বা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার আগে আর্টেমিসের নভোচারীরা চাঁদের বুকে থাকা ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মহাকাশযানটি ইতিমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ পথ পাড়ি দিয়েছে।
রবিবার মহাকাশচারীরা জানান, তাঁরা চাঁদের এমন কিছু দৃশ্য উপভোগ করেছেন যা এর আগে মানুষের চোখে কখনো ধরা পড়েনি।
১০ দিনের এই অভিযানের চতুর্থ দিন শেষ করে রবিবার ভোরের দিকে নভোচারীরা যখন ঘুমাতে যান, তখন নাসার তথ্য অনুযায়ী তাঁরা পৃথিবী থেকে প্রায় তিন লাখ ২১ হাজার ৮৬৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলেন। চাঁদ থেকে তাঁদের দূরত্ব ছিল এক লাখ ৩১ হাজার ৯৬৬ কিলোমিটার।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আর্টেমিস ক্রুদের তোলা একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে দূরে থাকা চাঁদের বুকে ‘ওরিয়েন্টাল বেসিন’ বা অববাহিকাটি দৃশ্যমান হতে দেখা গেছে।
নাসা জানিয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমেই প্রথমবার মানুষের চোখে সম্পূর্ণ অববাহিকাটি ধরা পড়ল। এর আগে বিশালাকার এই গর্ত বা খাদের ছবি কেবল কক্ষপথে থাকা ক্যামেরার চোখেই ধরা পড়েছিল।
মহাকাশ থেকে সরাসরি কানাডিয়ান শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ জানান ক্রুরা এই অববাহিকা দেখার জন্য সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত ছিলেন, যাকে কখনো কখনো চাঁদের ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ বলা হয়।
অভিযানের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি রবিবার রাত থেকে সোমবারের মধ্যেই অর্জিত হতে পারে এবং এ সময়ই নভোচারীরা ‘চাঁদের প্রভাববলয়ে’ প্রবেশ করবেন। এই জায়গায় পৌঁছালে মহাকাশযানের ওপর পৃথিবীর চেয়ে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান বেশি থাকবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে ওরিয়ন মহাকাশযানটি যখন চাঁদের চারপাশে ঘুরবে, তখন মার্কিন নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ, রিড উইজম্যান ও ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন ইতিহাসের যেকোনো মানুষের চেয়ে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে পৌঁছানোর নতুন রেকর্ড গড়বেন।
নাসা জানিয়েছে আর্টেমিস ক্রুরা ইতিমধ্যেই মহাকাশযানটি ম্যানুয়ালি চালানোর একটি ডেমো সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং চাঁদের চারপাশে ঘোরার সময় চন্দ্রপৃষ্ঠের কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করতে হবে ও ছবি তুলতে হবে, সেই পরিকল্পনাও শেষ করেছেন।
এর আগে মহাকাশচারীরা স্ক্র্যাম্বলড এগ এবং কফি দিয়ে তাঁদের সকালের খাবার শেষ করেন এবং চ্যাপেল রোনের তুমুল জনপ্রিয় পপ গান ‘পিঙ্ক পনি ক্লাব’ বাজিয়ে তাঁদের ঘুম থেকে জাগানো হয়।
কাজ শুরু করার সময় মহাকাশযানের কমান্ডার রিড উইজম্যান হিউস্টনের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে জানান, মহাকাশযানে থাকা সকল নভোচারীর মনোবল অত্যন্ত দৃঢ় আছে। দুই মেয়ের বাবা রিড উইজম্যান মহাকাশ থেকে তাঁর পরিবারের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং একে তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন। উইজম্যান এই পুরো অভিযানকে এক অতিমানবীয় কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মানুষ গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ে করে দেখাতে পারেনি।
নভোচারীদের ভূতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে তাঁরা চাঁদের প্রাচীন লাভাপ্রবাহ এবং বিশালাকার গর্তগুলোর ছবি তোলার পাশাপাশি সেগুলোর নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারেন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের অ্যাপোলো মিশনগুলোর তুলনায় তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
অ্যাপোলোর মহাকাশযানগুলো চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১১৩ কিলোমিটার উঁচুতে উড়লেও আর্টেমিস-২-এর নভোচারীরা প্রায় ছয় হাজার ৪০০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে উড়বেন।
এতে তাঁরা চাঁদের দুই মেরুসহ পুরো গোলাকার পৃষ্ঠটি দেখতে সক্ষম হবেন। নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক জন হানিকাট জানান যে মহাকাশচারীদের পাঠানো নতুন একটি ছবিতে চাঁদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে যা এর আগে মানুষ কেবল রোবোটিক যন্ত্রের মাধ্যমেই দেখতে পেয়েছিল।
বর্তমানে মহাকাশচারীরা স্মার্টফোন দিয়েও ছবি তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং এবারই প্রথম মহাকাশযাত্রায় নাসা স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আর্টেমিস-২ মিশনটি মূলত চাঁদে দীর্ঘমেয়াদে ফেরার একটি বড় পরিকল্পনার অংশ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চাঁদের বুকে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা। তবে এত নিখুঁত ও জটিল একটি অভিযানের মাঝেও নভোচারীদের ছোটবেলার লালিত স্বপ্নগুলো বাস্তবে ধরা দিচ্ছে এবং নভোচারী হ্যানসেন মহাশূন্যে ভেসে থাকার অনুভূতিকে রূপকথার মতো এক শৈশবের আনন্দের সাথে তুলনা করেছেন।