Image description

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে যেদিন প্রথম স্লোগান উঠেছিল, সেদিন কেউ ভাবেনি যে এই আন্দোলন এত ভয়াবহ রূপ নেবে। মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। কিন্তু এখন যখন সেই দিনগুলোর হিসাব মেলাতে বসেছেন বিশ্লেষকেরা, উঠে আসছে এমন কিছু প্রশ্ন, যা সহজে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

বিক্ষোভ চলাকালে হতাহতের যে সংখ্যা সামনে এসেছে, তা যেকোনো মানদণ্ডেই অস্বাভাবিক। ইরান সরকারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৩,১১৭ জন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, প্রকৃত সংখ্যা কমপক্ষে ৭,০১৫। এত বড় ব্যবধান জন্ম দিয়েছে একটি রহস্যের।

আরও রহস্যজনক হলো নিহতদের পরিচয় এবং মৃত্যুর ধরন। অনেক নিহত ব্যক্তি বিক্ষোভকারীও ছিলেন না, আবার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও নন। তাঁরা ছিলেন সাধারণ পথচারী, যাঁরা হয়তো ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিলেন।

উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগরতীরবর্তী একটি শহরের এক বাসিন্দা এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ৯ জানুয়ারি নিজের বাড়ির ছাদ থেকে তিনি দেখেন, বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে একটি নির্জন গলিতে দুজন তরুণী হাঁটছিলেন। হঠাৎ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পোশাকে থাকা এক ব্যক্তি পকেট থেকে রিভলভার বের করে তাদের গুলি করে পালিয়ে যায়। এই দৃশ্য তার চোখের সামনেই ঘটে।

কাজভিন শহরে আরেকটি ঘটনার কথা জানা গেছে, যা আইআরজিসির একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে। সেখানে একটি মা ও তার ছোট ছেলে নিহত হন এমন একটি সড়কে, যেখানে কোনো বিক্ষোভই ছিল না। তদন্তে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ইরানের কোনো সরকারি বাহিনীর তালিকাভুক্ত নয়।

বিক্ষোভের ধরনেও ছিল অস্বাভাবিক কিছু বিষয়। তেহরানের উপকণ্ঠে কিছু মানুষকে দেখা গেছে, যারা স্থানীয় বাসিন্দা নন, অথচ বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পূর্ব তেহরানের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, মাস্ক পরা একটি সুসংগঠিত দল মানুষকে স্লোগান দিয়ে উসকে দিচ্ছিল এবং সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে তারা উধাও হয়ে যায়। তাদের আচরণ ছিল অনেকটা পশ্চিমা বিক্ষোভে দেখা “ব্ল্যাক ব্লক” কৌশলের মতো, যেখানে একই রঙের পোশাক পরে পরিচয় গোপন রেখে বিক্ষোভে অংশ নেয়া হয়। ইরানে এর আগে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু বক্তব্য এখন নতুন আলোয় দেখা যাচ্ছে। মোসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে পরিচিত একটি ফার্সি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গত ২৯ ডিসেম্বর পোস্ট করা হয়েছিল, “আমরা শুধু দূর থেকে নয়, মাঠেও আপনাদের পাশে আছি।” ইসরায়েলের মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “আমাদের লোকেরা এখন সেখানে কাজ করছেন।” সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকা “প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকে” শুভেচ্ছা জানিয়ে।

নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরুর আগেই মোসাদপ্রধান ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, ইরানে তার এজেন্টরা নতুন গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম।

ইরানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেহেদি খারাতিয়ান এসব হত্যাকাণ্ডকে ২০২৪ সালের লেবাননের পেজার বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, সামরিক হামলার আগে জনমত প্রভাবিত করতেই এই রক্তপাত পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে।

তবে বিক্ষোভে অংশ নেয়া অধিকাংশ মানুষ সরকারের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, সরকার নিজের দমন-পীড়নের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে এই আখ্যান তৈরি করছে।

তেহরানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেন, তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের রাজনীতি পড়াচ্ছেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো, এখনকার প্রজন্মের ক্ষোভ ১৯৯৯, ২০০৯ বা ২০২২ সালের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর। এই পরিস্থিতিতে সত্য যাচাই করা কঠিন, কারণ সমাজ ইতোমধ্যে এতটাই বিভক্ত যে কোনো দাবিই নিরপেক্ষভাবে বিচার হওয়ার পরিবেশ নেই।

জানুয়ারির সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর প্রকৃত সত্য আজও অন্ধকারে। যুদ্ধের দামামা, রাজনৈতিক উত্তেজনা আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের ভিড়ে সেই সত্য আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই