বছরের পর বছর ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা করা এবং সদস্য দেশগুলোকে অপচয়কারী ও ফ্রি-লোডার বলে আক্রমণ করার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করে নিতে পারেন। এমন পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ভূমিকম্প হবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শীতল যুদ্ধের সময় টিকে ছিল এই ন্যাটো। ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের পর আরও বিস্তৃত হয়েছিল এই সংগঠন।
নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন যাকে সংক্ষেপে ন্যাটো বলা হয়, তা ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ১২টি দেশের সমন্বয়ে। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, কানাডা ও ডেনমার্ক। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৩২টি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা, যাকে তখন সম্প্রসারণবাদী হিসেবে দেখা হতো। একইসঙ্গে এটি এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যে ১৯৩০-এর দশকে এডলফ হিটলারকে ঠেকাতে সম্মিলিত নিরাপত্তার অভাব বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ন্যাটোর মূল ভিত্তি কী?
সম্মিলিত নিরাপত্তা, যা ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এ উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। শীতল যুদ্ধের সময় এই ধারা প্রয়োগ করা হয়নি। এটি একবারই ব্যবহার করা হয়- ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আল-কায়েদার হামলার পর। তখন সদস্য দেশগুলো আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে সেনা পাঠায়।
কেন ট্রাম্প ন্যাটো থেকে বের হওয়ার কথা ভাবছেন?
সাম্প্রতিকভাবে ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ বেড়েছে। কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটো তার পাশে দাঁড়ায়নি। তবে ন্যাটোর কোনো নিয়মই সদস্যদের এমন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করে না। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজে আক্রান্ত হয়নি এবং আগেই মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ করেনি।
ট্রাম্প সম্প্রতি ন্যাটো সম্পর্কে কী বলেছেন?
তিনি ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহার করা ‘পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে’ বলে উল্লেখ করেছেন। যা ইঙ্গিত দেয় তিনি ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে ইউরোপের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করবে না, যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে রক্ষা করে। যদিও আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধে ন্যাটোর সমর্থন এই দাবির বিরোধিতা করে।
ট্রাম্পের ন্যাটোর প্রতি গভীর বিরূপতা
মনে হচ্ছে আছে তার বিরূপ মনোভাব আছে। ২০১৭ সালে তিনি ন্যাটোকে ‘অপ্রচলিত’ বলেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকানোর অভিযোগ তোলেন। ২০২৪ সালে তিনি আরও বলেন, যে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে না, তাদের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে যা খুশি করতে উৎসাহিত করবেন। জানুয়ারিতেও ন্যাটোর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব দেখা যায়, যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন। পরে তিনি সরে দাঁড়ালেও অনেকেই মনে করেন বিষয়টি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
তার কথার প্রভাব কী পড়েছে?
হ্যাঁ, প্রভাব পড়েছে। ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করেছেন। গত জুনে ন্যাটো সদস্যরা ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এক দশক আগে অনেক দেশ ২ ভাগ লক্ষ্যও পূরণ করতে পারত না। ন্যাটোর মহাসচিব সাবেক ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে ট্রাম্পকে খুশি রাখতে বিশেষভাবে চেষ্টা করেছেন। তিনি ট্রাম্পকে ‘জোটের বাবা’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি ইরান যুদ্ধের পক্ষেও কথা বলেছেন, যা অন্যান্য ন্যাটো সদস্যদের অবস্থানের বিপরীত।
ট্রাম্প কি ঠিক বলছেন ন্যাটো ‘কাগুজে বাঘ’?
না। ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর সামরিক সহায়তা রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে রাশিয়া ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ওপর হামলা করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যেমন পোল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলো (লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া)। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বহুদিন ধরে ন্যাটোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন, যাতে পূর্ব ইউরোপে তার প্রভাব বাড়ানো যায়। অতীতে ১৯৯৯ সালে ন্যাটো সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোশেভিচকে কসোভোয় মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধন থেকে বিরত রাখতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। সংক্ষেপে বর্তমান অবস্থায় ন্যাটো ‘কাগুজে বাঘ’ নয়। তবে ট্রাম্প যেভাবে পুতিনের ভাষা ব্যবহার করছেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে কী দেয়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পারমাণবিক সুরক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বৃটেন ও ফ্রান্সের তুলনায় অনেক বড়। এছাড়া ইউরোপজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, বিশেষ করে জার্মানিতে। তুরস্কের ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ঘাঁটি পশ্চিমা দেশগুলোর শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে।
ট্রাম্প কি সহজেই যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিতে পারবেন?
এটি জটিল বিষয়। ২০২৪ সালের একটি আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ন্যাটো থেকে বের হতে পারবেন না, যদি না সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পান বা কংগ্রেস অনুমোদন দেয়। তবে ট্রাম্প অতীতে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে কাজ করেছেন। যেমন ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী অনুমতি ছাড়াই ইরানে হামলা চালানো। এছাড়া সরাসরি বের না হয়েও তিনি ন্যাটোকে দুর্বল করতে পারেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আইভো ডাল্ডার বলেছেন, ট্রাম্প এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন যেখানে তিনি ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেবেন এবং কমান্ড কাঠামো থেকে কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেবেন। তবে দাবি করবেন তিনি এখনও আর্টিকেল ৫ মেনে চলছেন, যদিও বাস্তবে সামরিক সহায়তা দিচ্ছেন না।