Image description

ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের জল্পনা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে তেহরানের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির চিত্র। বহুস্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা, লাখ লাখ যোদ্ধা এবং কঠিন ভূপ্রকৃতির সমন্বয়ে এমন এক কৌশল সাজিয়েছে ইরান, যা বাস্তবে রূপ নিলে মার্কিন বাহিনীর জন্য হতে পারে অত্যন্ত কঠিন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান শুধু প্রতিরোধই করবে না, বরং বহুস্তরের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত হবে।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ইউরেনিয়াম দখলের জন্য মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেন, তাহলে তাদের বেসামরিক মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের সঙ্গে বা আড়ালে থাকা যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়তে হবে না। বরং তারা মুখোমুখি হবে এক ভিন্ন ধরনের শত্রুর— শত-সহস্র যোদ্ধা নিয়ে সংগঠিত এমন একটি বাহিনী, যারা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষায় মৃত্যুকেই সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে দেখে।

মার্কিন বাহিনীর জন্য ইরানের সেনাবাহিনী শুধু একটি বাধা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হবে এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার, যা গত চার দশক ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে তুলেছে তেহরান। এই প্রতিরক্ষা কাঠামো বহুস্তরবিশিষ্ট, আর প্রতিটি স্তর আলাদা দূরত্ব ও উচ্চতায় ভিন্ন ভিন্ন হুমকি মোকাবিলার জন্য তৈরি।

 

তেহরান যদি ইউরেনিয়াম ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম দখলের ট্রাম্পের পরিকল্পনাই হতে পারে এই প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর এই মিশনে ইরানের এক বা একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় শত শত সেনা মোতায়েন করতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল।

মার্কিন বাহিনীকে ইরানের মতো ভৌগলিকভাবে সুরক্ষিত দেশের ভেতরে ঢুকে লড়াই করতে হবে, পাহাড়ি প্রতিরক্ষা অতিক্রম করে উড়ে যেতে হবে, গোলাগুলির মধ্যেই তেজস্ক্রিয় উপাদান সংগ্রহ ও প্যাকেজ করতে হবে, তারপর সেই দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এসব মোকাবিলার জন্য ইরানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সংগঠিত অবস্থায় আছে।

সাবেক মার্কিন অ্যাডমিরাল ও ন্যাটোর সাবেক কমান্ডার জেমস স্টাভ্রিডিস বলেন, এমন অভিযান ‘সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশন’ হতে পারে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেকোনও সামরিক অপশনই গ্রহণ করা জটিল হয়ে পড়ে।

 

ইরানের প্রায় প্রতিটি স্থাপনা তথা সম্ভাব্য ঘাঁটিই, যেমন পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি বা আশপাশের বিমানবাহী জাহাজ থেকে ৬০০ মাইলেরও বেশি দূরে। এই দূরত্ব জয় করে যেকোনও অভিযান চালাতে চাওয়াকেও বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

এছাড়া ভূপ্রকৃতিও প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে কাজ করে। পশ্চিম ইরানজুড়ে প্রায় ১০০০ মাইল বিস্তৃত জাগরোস পর্বতমালা উপকূল ও অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করেছে। মার্কিন বাহিনী যদি কোনোভাবে এসব স্থাপনায় পৌঁছায়ও, তখন তাদের ভাঙা টানেলের মধ্যে লড়াই করতে হতে পারে, যেখানে ভেতরের প্রতিরক্ষাকারীরা শেষ পর্যন্ত যন্ত্রপাতি এমনকি ইউরেনিয়ামও ধ্বংস করে দিতে পারে।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে দেশে ঢুকতে বাধা দেয়া নয় বরং ঢোকার পর তাদের নিজেদের সেখানে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব করে তোলা। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী যদি খারগ, আবু মুসা বা লারাক দ্বীপে নেমেও যায়, সেগুলোতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাও মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

 

এই প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্ব ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর। ইরানের এই বাহিনী প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধের জন্য বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। আর এই কৌশল গড়ে উঠেছে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে। সেসময় ইরানের শহরগুলোতে ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তেহরানের দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছিল।

দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ইরানের সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষা স্তরে রয়েছে দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি অনেক দূর থেকেই হুমকি শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। মাঝের স্তরে রয়েছে মাঝারি পাল্লার, উচ্চ গতিশীলতার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি যুদ্ধবিমান, ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন মোকাবিলা করে।

এছাড়া ইরানের কাছে ‘মিসাঘ’ ও ‘শাহাব সাকেব’সহ কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়ে হেলিকপ্টার ও নিচু দিয়ে উড়া বিমানে হামলা চালানো সক্ষম। ইরানের দাবি, তাদের কাছে স্থলযুদ্ধের জন্য ১০ লাখের বেশি যোদ্ধা প্রস্তুত, যার মধ্যে আইআরজিসি, বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারাও রয়েছেন।

যদিও তাদের প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা অজানা, তবুও এই সংখ্যা যেকোনও দখলদার বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এসহাক জাহাঙ্গিরি বলেন, ‘এই যুদ্ধ শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল হবে স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করা, সেটা খারগ দ্বীপ হোক বা অন্য কোথাও থেকে।’

তিনি বলেন, ‘ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতে হলে রক্তের সাগর পার হতে হবে, এটাই আমাদের উত্তর।’

যদি মার্কিন বাহিনী পারমাণবিক স্থাপনা দখল করতে পারে, তাহলে তাদের লক্ষ্য হবে ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেয়া, আর এটি অত্যন্ত জটিল কাজ। এই ধরনের ইউরেনিয়াম পরিবহনে বিশেষ সরঞ্জাম, কনটেইনার ও ডিকন্টামিনেশন প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

 

মার্কিন সেনাদের গোলাগুলির মধ্যেই এসব প্যাকেজ করতে হবে এবং নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। এই ইউরেনিয়াম আবার বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন আকারে রয়েছে। কিছু গ্যাস আকারে, কিছু পাউডার বা ধাতু হিসেবে, আর অনেকটাই গত বছরের হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সবকিছু উদ্ধার করতে শুধু দখল নয়, দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে, আর সেসময় ইরান সর্বশক্তি দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করবে। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে তা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে।

সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, মার্কিন সেনা ইরানে আসলে তারা ‘অন্য আরও ফ্রন্ট খুলবে’— যার মধ্যে উপসাগরীয় অবকাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করার চেষ্টা থাকতে পারে।

 

তেহরানের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানকে এমন ব্যয়বহুল করে তোলা, যাতে এর মূল্য মিশনের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একাধিক ফ্রন্ট খুললে মার্কিন কমান্ডারদের ইরানের ভেতরের অভিযান চালানো বা অন্যত্র প্রতিরক্ষার দিকে মনোযোগ দেয়া— এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে।

 

এক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ হতে পারে ১৯৮০ সালে তেহরানে মার্কিন জিম্মিদের উদ্ধারের ব্যর্থ অভিযান। সেই অভিযান রাজধানী থেকে ২০০ মাইল দূরের মরুভূমিতে গিয়ে শেষ হয়েছিল। সে অভিযানে ২০০ জনেরও কম সেনা ছিল এবং একটি মাত্র স্থানে পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল। আর এখনকার পরিকল্পনায় শত শত মাইল দূরের একাধিক সুরক্ষিত স্থাপনা জড়িত, ফলে বর্তমানে জটিলতা বহু গুণ বেশি।

ইরাক ও আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে শত্রুভাবাপন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী স্থল অভিযান কতটা কঠিন। স্থানীয় মিত্র ও নিরাপদ সরবরাহ লাইন থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠেছিল। আর ইরানে তো সেই সুবিধাগুলোই নেই। সেখানে না রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী, না রয়েছে নিরাপদ সরবরাহ পথ।

 

অন্যদিকে ইরানি যোদ্ধা তথা প্রতিরক্ষাকারীরা নিজেদের ভূখণ্ডে লড়বে, দ্রুত শক্তি জড়ো করতে পারবে এবং সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। সব দিক থেকেই কৌশলগত সুবিধা ইরানের দিকে ঝুঁকে আছে। তবে এটি এমন এক সংঘাত, যার মুখোমুখি আগে কোনও পক্ষই হয়নি।