Image description

 Sabina Ahmed (সাবিনা আহমেদ)

 
এটি আর শুধু পরিকল্পনার পর্যায়ে নেই। যুদ্ধের সেনা আর যন্ত্রপাতি পুরোদমে জায়গামত পৌঁছে গেছে। যখন গণমাধ্যমে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির আলোচনার খবর চলছে, তখন পেছনে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর বড় আকারের ট্রুপ মুভমেন্ট ও লজিস্টিকস প্রায় সম্পূর্ণ।
 
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই শুধু কূটনৈতিক আলোচনায় বিশ্বাস করে না। তাঁর দর্শন স্পষ্ট — “জোর যার মুল্লুক তার”। আমেরিকার কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে তাঁর হাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও মন্ত্রীরা — পিটার হেগসেথ (ডিফেন্স/ওয়ার সেক্রেটারি), মার্কো রুবিও (সেক্রেটারি অফ স্টেট ) এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু — সবাই যুদ্ধপ্রিয়। এঁদের কাছে শক্তি প্রয়োগ, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত ও কৌশলগত দখলই আসল কার্যকর পদ্ধতি।
এ কারণে পাকিস্তানের মাধ্যমে চলমান “১৫-পয়েন্ট যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব” ও আলোচনা কেবলই আই-ওয়াশ। ট্রাম্প সম্ভবত পরবর্তী বড় ধাপের জন্য সময় কিনছে।
 
ইরানও এই বাস্তবতা বোঝে। তাই তারা পাকিস্তানের সাথে কথা বলার পাশাপাশি সৌদি আরব ও কাতারের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। ইরান চাচ্ছে না গালফের দেশগুলো এই যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক, বিশেষ করে সৌদি আরব আর কাতার। ইরান বর্তমানে সৌদি আরব আর কাতারে আক্রমণ অনেক কমিয়ে দিয়েছে, যাতে সৌদি সরাসরি যুদ্ধে না জড়ায়। ফলে সৌদি ও কাতারে অফিস, ব্যাংক, স্কুল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত-এ এখনো নিয়মিত আক্রমণ চলছে, তাই সেখানে পুরোপুরি স্বাভাবিকতা ফিরতে আরও সময় লাগবে। ইরান চায় না বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে গালফের সব রাষ্ট্র একসঙ্গে তার বিপক্ষে চলে আসুক।
যুদ্ধের পরবর্তী থিয়েটার হতে যাচ্ছে খার্গ দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও হরমুজ প্রণালী।
 
ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০% এই দ্বীপ দিয়ে যায়। বছরে প্রায় ৫০+ বিলিয়ন ডলারের তেল। এটি দখল বা অবরোধ করলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবে।
বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০% এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ইরান এটি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে।
 
তাই আমেরিকা তার যুদ্ধটা এখানে নিয়ে এসেছে এখন। আমেরিকান ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন থেকে প্রায় ২০০০ প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল ব্র্যান্ডন টেগটমেয়ার ও তাঁর স্টাফ রয়েছেন।
এই ইউনিট বিশ্বের যেকোনো স্থানে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে মোতায়েন করতে পারে। তারা বিমান থেকে লাফিয়ে শত্রুর পেছনে ঢুকে বিমানঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করতে বিশেষজ্ঞ। মার্চ ১২ থেকে অন্তত ৩৫টি ভারী C-17 পরিবহন বিমানের ফ্লাইট শনাক্ত হয়েছে যেগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ল্যান্ড করেছে । এগুলো এসেছে ফোর্ট ব্র্যাগ, হান্টার আর্মি এয়ারফিল্ড, লুইস-ম্যাককর্ডসহ এয়ারবর্ন ও স্পেশাল অপারেশনস ইউনিটের ঘাঁটি থেকে। এ ধরনের বড় মুভমেন্ট সাধারণত আসল অপারেশনের প্রস্তুতির লক্ষণ।
একই সঙ্গে ২,২০০ থেকে ২,৫০০ মেরিনের এক্সপেডিশনারি ইউনিট (৩১তম MEU) USS Tripoli ও অন্যান্য জাহাজে করে হরমুজ ও বন্দর আব্বাসের খুব কাছে পৌঁছে গেছে। এরা অ্যাম্ফিবিয়াস আক্রমণে বিশেষজ্ঞ। সম্ভাব্য পরিকল্পনা হচ্ছে মেরিনরা উপকূলীয় বিমানঘাঁটি দখল করে এয়ারবর্ন সৈন্যদের সাপোর্ট দেবে।
 
ইরানের প্রস্তুতি নিয়েছে। ইরানও জানে কী আসছে। খার্গ দ্বীপে তারা অতিরিক্ত সৈন্য, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, MANPADS এবং অ্যান্টি-পার্সোনেল ও অ্যান্টি-আর্মর মাইন পেতেছে। উপকূলে মাইন পেতে “কিল জোন” তৈরি করা হচ্ছে। এখানে যুদ্ধ হলে তা রক্তাক্ত হবে — উভয় পক্ষেরই বড় ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা।
 
ট্রাম্প প্রশাসনের এই দ্বৈত কৌশল, আলোচনা এবং সামরিক চাপ, ঐতিহাসিকভাবে তাঁর “ম্যাক্সিমাম প্রেশার” নীতির সাথে মিলে। আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করে ইরানকে আরও বেশি প্রেসারে রাখাটাই এখন অন্যতম লক্ষ্য, যাতে ইরানের সরকার ক্র্যাক করে, ছাড় দেয় শুরু করে। কিন্তু এই দ্বৈত নীতিতে ঝুঁকিও আছে — খার্গ দ্বীপ বা হরমুজে স্থল অভিযান হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও বড় আকার দিতে পারে এবং তেলের দাম বিশ্বব্যাপী আরও উর্ধ্বমুখী করবে।
আমেরিকান এয়ারবর্ন ও মেরিনের দ্রুত মোতায়েন ক্ষমতা যুদ্ধের গতি বদলে দিতে পারে। তবে সময় ইরানের পক্ষেই থাকবে। ড্রোন, মিসাইল, মাইন ও প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী এসিমেট্রিক যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
 
এখন উভয়পক্ষের ট্রুপ মুভমেন্ট প্রায় সম্পূর্ণ। আক্রমণ যেকোনো সময় শুরু হতে পারে। গণমাধ্যমে শান্তির কথা চললেও, পেছনে চলছে ভয়ঙ্কর যুদ্ধের প্রস্তুতি। যুদ্ধ এই পর্যায়ে পৌঁছালে সহজে থামবে না, কিন্তু ফলাফল নির্ভর করবে কে কত লাশ বহন করার ক্ষমতা রাখবে। প্রায় ৮ বছর ধরে চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরানের প্রায় ২ লাখেরও বেশি সেনা ও যোদ্ধা শহীদ হয়েছিল। এই রক্তাক্ত যুদ্ধ ইরানকে শিখিয়েছে যে, শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ও অসম যুদ্ধের কৌশলেও শত্রুকে ক্লান্ত করা যায়।
আজকের পরিস্থিতিতে ইরান কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি চায় না। তারা জানে, যদি শুধু অস্থায়ী থামাথামি হয়, তাহলে আবার যুদ্ধ শুরু হবে — “যুদ্ধবিরতি-ফের যুদ্ধ” এই চক্রে আটকে পড়বে। তাই ইরানের লক্ষ্য স্পষ্ট: যুদ্ধকে প্রতিপক্ষ তথা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এতটা ব্যয়বহুল ও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ইরানকে সহজে আক্রমণ করতে সাহস না পায়।