আলজাজিরার কলাম
আমার গভীর সহানুভূতি ইরানের মানুষের প্রতি, যাদের মন আজ নানা টানাপোড়েনে ছিন্নভিন্ন। অনেকেই স্বাধীনতা ও মর্যাদা কামনা করেন, কিন্তু একইসঙ্গে তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের দেশসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে সতর্ক ও শঙ্কিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তারা এক ধরনের আধিপত্যের বদলে আরেকটি আধিপত্য চাননি। তারা সব ধরনের নিপীড়নের অবসান চেয়েছিলেন—পশ্চিমা প্রভাবের নতুন শৃঙ্খল নয়। তারা যেকোনো মূল্যে পরিবর্তনও চাননি।
ইতিহাস বারবার আমাদের শিখিয়েছে পশ্চিম যেসব ‘স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি’ দেয়, তা কখনোই পূরণ হয় না। কারণটি সহজ। অন্যের স্বাধীনতা পশ্চিমাদের প্রকৃত লক্ষ্য নয়, তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য যাই হোক না কেন। এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদ স্বাধীনতা চায় না; চায় নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য, ক্ষমতা ও মুনাফা।
গত ৪ মার্চ তেহরানে চারদিকে বোমা পড়ার মধ্যে, ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী মোহাম্মদ মালজু অবশেষে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে সক্ষম হন। তিনি তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছিলেন: ‘যারা মনে করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে লক্ষ্য করে ইরানের ওপর আগুন ঝরালেও জনগণ অক্ষত থাকবে—তারা হয় যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝে না, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে তা উপেক্ষা করে। বোমা কোনো পার্থক্য করে না। ধ্বংস বাছবিচার করে না।’
তার এই সতর্কবার্তার সত্যতা ফিলিস্তিন থেকে ইরান পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়।
‘নিপীড়নের ছায়ায় জীবন বিকশিত হয় না। ধ্বংসস্তূপের নিচেও তা বেড়ে ওঠে না।’ একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে এ কথাগুলোর বেদনা ও দৃঢ়তা আমি গভীরভাবে অনুভব করি। সংহতি না জানিয়ে পারি না।
আমরা ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের ভয়াবহতা নিজের শরীরেই বহন করি। আমরা জানি বিস্ফোরণের কম্পন, এতিমদের কান্না, আর আগুনে পুড়তে থাকা রাতগুলোর নির্ঘুম হতাশা কেমন। ১৯৪৮ সালের নাকবা (মহাবিপর্যয়) থেকে শুরু করে বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ পর্যন্ত—প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা এই যন্ত্রণা অনুভব করেছি। অন্যদের দুর্দশায় আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি দেখতে পাই।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এক ঘটনার মাধ্যমে—একটি স্কুলে হামলা। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় দুই বছর ধরে প্রতিদিন গড়ে একটি শ্রেণিকক্ষের সমান শিশু নিহত হয়েছে; মোট ৫৬৪টি স্কুলের মধ্যে ৪৩২টি সরাসরি ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে।
দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘শাজারেহ তাইয়্যেবেহ’ও একইভাবে সরাসরি হামলার শিকার হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত দুটি উচ্চনির্ভুল টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছয় থেকে বারো বছর বয়সি প্রায় ১৭০ জন ছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মকর্তা নিহত হন।
প্রথম হামলার পর শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে ছুটে যান। আহতদের উদ্ধার করতে পৌঁছান চিকিৎসাকর্মীরা। আর তখনই নেমে আসে দ্বিতীয় বোমা। এটি ছিল ‘ডাবল-ট্যাপ’ হামলা—আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়াবহ কৌশল, যা গাজার মানুষ খুব ভালো করেই চেনে। প্রথমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা, তারপর উদ্ধারকারীদের হত্যা করা—এটাই এর উদ্দেশ্য।
গাজার মতোই, মিনাবের এই হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। গত তিন সপ্তাহে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জনবহুল স্থাপনাগুলোর ওপর মৃত্যু ও ধ্বংসের বৃষ্টি ঝরিয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, ক্রীড়াঙ্গন, স্টেডিয়াম, দোকান, ক্যাফে, বাজার ও ঐতিহাসিক স্থাপনা—সবই আক্রমণের শিকার হয়েছে। ৫ হাজারের বেশি আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৯০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
গাজার মতোই, এর লক্ষ্য শুধু ভৌত ধ্বংস নয়, বরং ভয় ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়া। বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—নিরাপত্তা ও স্বাভাবিকতার ধারণাকেই আঘাত করা।
বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তবুও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনকে দেখছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার প্রকাশ করেছেন—তিনি ‘যুদ্ধের নিয়মকানুন’কে ‘বোকামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এখন স্পষ্ট, গাজা হয়ে উঠেছে ইসরায়েলের পরীক্ষাগার—একটি মডেল, যা তারা পুরো অঞ্চলে প্রয়োগ করতে চায়।
কয়েক দিন আগেই ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ সতর্ক করে বলেছেন, ‘দাহিয়েহ (বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল) খান ইউনিসের মতো হয়ে যাবে।’
আমার জন্মস্থান খান ইউনিসের ধ্বংস এখন অন্যত্র প্রয়োগযোগ্য এক মডেলে পরিণত হয়েছে। লেবাননে মাত্র ২০ দিনে এই মডেলের ফলে প্রায় ১ হাজার ১০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২০ জন শিশু। প্রতি তিন দিনে একটি পূর্ণ শ্রেণিকক্ষের সমান।
গাজায় যা ঘটে, তা লেবাননে যায়, সেখান থেকে পৌঁছে যায় ইরানে।
চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? অঞ্চলে ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। কৌশলটি হয়তো সরাসরি ইরানি সরকারকে উৎখাত করা নয়; বরং ইরান রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেওয়া, যাতে তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কমে যায়। একটি দুর্বল বা ভেঙে পড়া ইরান আর ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রাধান্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
এই সবকিছুই ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনে। সম্প্রতি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিও এই অবৈধ যুদ্ধে নীরব সম্মতি দিয়েছে। যদিও তারা নিজেদের সেনা, জাহাজ বা বিমান পাঠাতে আগ্রহী নয়।
মাহমুদ দারবিশ তার কবিতা ‘দ্য আর্থ ইজ ক্লোজিং অন আস’-এ লিখেছেন, ‘শেষ সীমান্তের পর আমরা কোথায় যাব? শেষ আকাশের পর পাখিরা কোথায় উড়বে? শেষ নিশ্বাসের পর গাছপালা কোথায় আশ্রয় নেবে?’
শিগগিরই এটি পুরো অঞ্চলের বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের অধীনে আমরা সবাই হয়তো মনে করব—আমাদের যাওয়ার মতো আর কোথাও জায়গা নেই। সেই বাস্তবতায় জীবন কেমন হবে?
যদি গাজাই হয় পরীক্ষাগার, তাহলে বোঝা যায়—পুরো অঞ্চলই বছরের পর বছর আগুনে জ্বলবে। যখনই ইসরায়েল চাইবে, তারা ‘ঘাস কাটার’ মতো অভিযান চালিয়ে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেবে। যে কোনো সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জনগণের যে কোনো প্রতিরোধ দমন করতে চাইবে তারা।
লেখক: তৃতীয় প্রজন্মের একজন ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং বর্তমানে কানাডার ট্রিটি ৬ ভূখণ্ডের আমিস্কওয়াচিওয়াস্কাহিকান (এডমন্টন)-এ অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত।
আলজাজিরার ইংলিশ বিভাগ থেকে অনূদিত।