Image description

মধ্যপ্রাচ্যে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বনাম ইরান সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্নটা আর কে জিতবে তা নয়, বরং কীভাবে এই যুদ্ধের শেষ হবে, সেটাই বড় হয়ে উঠছে। প্রতিটি পাল্টা হামলা অঞ্চলটিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

তবে ইতিহাস বলছে, সবচেয়ে জটিল সংঘাতও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো আলোচনার পথেই গড়ায়। মূল প্রশ্ন হলো - কখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, আর কখন তা থামানোই হয়ে ওঠে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

 

ইরান ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোতে সাম্প্রতিক হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে তারা একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক দেশগুলো মিলিতভাবে ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারে। প্রস্তাবটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত হলেও এটি আলোচনার একটি সম্ভাব্য দরজা খুলে দেয়।

 

অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোও সরাসরি এই সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। তারা সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এবং মূলত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। কারণ, ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সহজেই দীর্ঘ ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার উদাহরণ ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এখনও তাদের স্মরণে তাজা।

 
 

 

এদিকে ইসরাইলের দৃষ্টি ধীরে ধীরে লেবাননের দিকে সরছে, যেখানে হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। এমন জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেখানেই যৌথ বা স্বাধীন তদন্ত একটি সম্ভাব্য প্রথম ধাপ হতে পারে।

 

যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি

 

এই সংঘাতের শেষ সম্ভবত কোনো স্পষ্ট সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে হবে না। একইভাবে তাৎক্ষণিক শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও কম। বরং নিকট ভবিষ্যতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো একটি সীমিত যুদ্ধবিরতি বা ‘ফ্রিজড কনফ্লিক্ট’।

 

এ ধরনের যুদ্ধবিরতির জন্য প্রত্যেক পক্ষকেই কিছুটা সাফল্যের দাবি করার সুযোগ রাখতে হবে। প্রথম ধাপে হামলা কমানো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে সামুদ্রিক পথ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করতে হবে, যাতে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

 

পরবর্তী ধাপে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি হামলা বন্ধের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। এখানে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামরিক বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এটিকে সীমিত লক্ষ্য অর্জনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে, আর ইরান দেখাবে—চাপের মুখেও তারা টিকে আছে।

 

অর্থাৎ, যুদ্ধের সমাপ্তি হবে না কোনো নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে; বরং এক ধরনের ‘মুখরক্ষা’ এবং আংশিক লক্ষ্য অর্জনের সমঝোতায়।

 

চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা

 

পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় বড় শক্তিগুলোর মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে; বিশেষ করে চীন। ইরান, উপসাগরীয় দেশ এবং ইসরাইল; সবার সঙ্গেই চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে চীনের ভূমিকা এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

 

একই সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক, ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো ‘ব্যাক-চ্যানেল’ কূটনীতির মাধ্যমে সংলাপ এগিয়ে নিতে পারে। ইউরোপীয় দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। ইরান চায় উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করুক, আর ইসরাইল চায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা তাদের জন্য হুমকি হয়ে না উঠুক।

 

লেখক : হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক।

 

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]