দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনা-সমালোচনা আর আন্দোলনের পর ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজের জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ জন্য প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির’ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে অধ্যাদেশ জারির পর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে এই সাত কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রমও চালু থাকবে। এত দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল এসব কলেজ।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশের খসড়াটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে অধ্যাদেশ জারির পর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে এই সাত কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রমও চালু থাকবে। এত দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল এসব কলেজ।
পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে।
ঢাকার এই সাত কলেজকে ঘিরে সংকট নতুন নয়। ২০১৭ সালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর সরকার কলেজগুলো একীভূত করে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ নেয়। তবে প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়, শুরু হয় আন্দোলন। এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশের খসড়া নতুন করে পরিমার্জন করে, যেটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে একই একাডেমিক কাঠামোর আওতায় এনে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জট নিরসনই এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে পরিচালিত হবে। কলেজগুলোর নিজস্ব পরিচয়, অবকাঠামো ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর তাদের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।
আগের করা প্রথম খসড়ায় একেকটি কলেজকে নিয়ে আলাদা স্কুলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা ছিল। যেমন ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে স্কুল অব সায়েন্সের কার্যক্রম চলার কথা বলা হয়েছিল। নতুন খসড়ায় সেই ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে পরিচালিত হবে।
প্রেস উইং জানিয়েছে, অনুমোদন করা অধ্যাদেশের খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছে। আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি সিনেট মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষা, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিদর্শন, মূল্যায়ন ও নির্দেশনার ক্ষমতা পাবে।
প্রেস উইং আরও জানায়, কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলাসহ পৃথক পৃথক ‘স্কুল’ থাকবে, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন ‘হেড অব স্কুল’। সংযুক্ত কলেজগুলোয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠদান, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন সময়সূচি ও মূল্যায়ন কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
স্কুল বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিভাগ বা ডিসিপ্লিনের সমন্বিত কাঠামোকে বোঝানো হয়েছে, যা মূলত অনুষদের বিকল্প।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল এবং কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস বা সংযুক্ত কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। কলেজগুলোয় কেন্দ্রীয়ভাবে এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষক উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে বৈষম্য ছাড়া দেশি-বিদেশি সব উপযুক্ত শিক্ষার্থীর ভর্তি ও ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিধান সংযোজিত হয়েছে অনুমোদিত খসড়ায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ মনে করে, এই সিদ্ধান্ত সাতটি কলেজের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে সহায়ক হবে এবং রাজধানীতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও গবেষণাসমৃদ্ধ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে।
অনুমোদিত অধ্যাদেশের খসড়া অনুযায়ী আবাসিক হল সুবিধা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম চালুর বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ মনে করে, এই সিদ্ধান্ত সাতটি কলেজের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে সহায়ক হবে এবং রাজধানীতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও গবেষণাসমৃদ্ধ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শিক্ষা, গবেষণা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ইউজিসি নিয়মিত তদারক করবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।
অবসর ও কল্যাণসুবিধা বোর্ড
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরসুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট অধ্যাদেশের খসড়াও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে। এতে স্থায়ী পদধারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচালককে পরিষদের সদস্যসচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণসংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া হয় এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। পৃথক দুটি পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে এগুলো পরিচালিত হয়।