Image description

২০২৫ সালটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আন্দোলন, নিরাপত্তাহীনতা, প্রশাসনিক বড় সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পালাবদলের এক ঘটনাবহুল ও অস্থির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিক্ষোভ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীর মৃত্যু, দীর্ঘ সময় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকা, শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এবং ডাকসু নির্বাচনে ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বছরজুড়েই উত্তাল ছিল দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। 

বছরের শুরুতেই ১০ মার্চ সারা দেশে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়। সেদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে অন্তত ১২টি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লাঠি ও মশাল মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও কলাভবন এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। আন্দোলনের মুখে বিভিন্ন বিভাগ ও ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ধর্ষণের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয় ১৪ মে দিবাগত রাতে। ওইদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত হন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য। এই হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা জোরদার ও উদ্যানের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। 

এদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি, জিএস ও এজিএস—এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদেই বড় জয় পায় ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। দীর্ঘ সময় পর নেতৃত্বের এই পরিবর্তন ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

একাডেমিক ক্ষেত্রেও বছরটি ছিল ব্যতিক্রমী। ২০২৫ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শুরুতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। একই বছরে দুই ব্যাচের পরীক্ষা আয়োজন শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের ওপর যেমন চাপ তৈরি করেছে, তেমনি একাডেমিক ক্যালেন্ডারের শৃঙ্খলা নিয়েও সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। 

এর মাঝেই ২৩ নভেম্বর এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিস্থিতিতে ১৫ দিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে শীতকালীন ছুটি যুক্ত হয়ে মোট ১ মাস ৫ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকে। আবাসিক হলগুলোর ঝুঁকি নিরূপণ ও সংস্কারের জন্য শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ায় একাডেমিক ক্ষতি ও মানসিক চাপ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়।

বছরের আরেকটি আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা ছিল শিক্ষক দ্বারা যৌন হয়রানির অভিযোগ। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এরশাদ হালিমের বিরুদ্ধে ছাত্রদের যৌন হয়রানি ও মারধরের অভিযোগ উঠলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। এই ঘটনা ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করে। 

পাশাপাশি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে ২০২৫ সালজুড়েই শাহবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে দাফন করার পর সেই স্থানটি বছরজুড়ে প্রতিবাদের প্রতীকী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ছিল এক চরম অস্থিরতা ও পরিবর্তনের বছর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি সালতামামি ২০২৫, ডাকসু নির্বাচন ২০২৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, সাম্য হত্যাকাণ্ড, ওসমান হাদি বিচার, ঢাবি ছাত্র রাজনীতি, ভূমিকম্পে হল বন্ধ।