ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বড় ধরনের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। পাশাপাশি মানবিক বিভাগে মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করায় গড় পাসের হারে এর প্রভাব পড়েছে।
এবার প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এর মধ্যে শুধু ইংরেজি ও আইসিটিতে অকৃতকার্য হয়েছেন তিন লাখ ৮২ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ৬৪ শতাংশ এ দুই বিষয়ে পাস করতে পারেননি।
দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গতকাল শনিবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। পাসের এই হার ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এক মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে। আগামী ২ ডিসেম্বর পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হচ্ছে বলে ঢাকা বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে।
দেশে ইংরেজি ও হিসাববিজ্ঞান শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত শিক্ষাবিষয়ক গবেষণাগুলোতে এ সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভালো করতে পারছে না। উচ্চ মাধ্যমিক ও পরবর্তী পর্যায়ে এর প্রভাব রয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা পেছনে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি অনেকটা দায়ী বলে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে শিখতে পারছে না।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের একটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানরত ৫৬ শতাংশ শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কাঠামোগত কারণে ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করতে পারছে না। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি এর বড় কারণ। ইংরেজির ক্ষেত্রে পড়া, লেখা ও বলার নিয়মিত চর্চা না থাকার কথাও উল্লেখ করেন তারা।
ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্রদের অর্ধেকের বেশি ফেল করেছেন। ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অকৃতকার্য হওয়ার হার ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে পাস করেছেন ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফেল করেছেন তিন লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ইংরেজিতে দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ বা ৪১ শতাংশ এবং আইসিটিতে এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন বা ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ অকৃতকার্য হয়েছেন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর দুই-তিনটি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক খারাপ ফল করে। এবার ইংরেজি ও আইসিটিতে অকৃতকার্য হয়েছে অনেকে। এ কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে।
এবার শুধু পাসের হারই কমেনি, উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যাও। ২০২৫ সালে পুনর্নিরীক্ষণসহ জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন। এবার পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গতবারের তুলনায় জিপিএ ৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন বা প্রায় ৪২ শতাংশ। জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন।
এ বছর শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ফলের তলানিতে থাকা বরিশাল বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জসিম উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘এই ফল একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। পাস করতে হলে পড়তে হবে– এমন একটি বার্তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করি, শিক্ষার্থীরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে পড়ার টেবিলে ফিরবে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাসের হার বৃদ্ধি পাবে।’ তিনি বলেন, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকের নির্দেশনা থাকত, পাসের হার ও জিপিএ ৫ বাড়াতে হবে। দুই বছর ধরে নির্দেশনা রয়েছে, উত্তরপত্রে যতটুকু লিখেছে, ততটুকুই নম্বর দিতে হবে।
ইংরেজি-আইসিটিতে দুর্বলতা, দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
ইংরেজিতে বরিশাল ও যশোরে ৪৬ শতাংশ, দিনাজপুর ও রাজশাহীতে ৪৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪১ শতাংশ, সিলেট ও চট্টগ্রামে ৩৫ শতাংশ ফেল করেছে। আইসিটিতে সর্বোচ্চ ফেল বরিশালে, ৩৪ শতাংশ। যশোরে ৩৩ এবং রাজশাহীতে ৩২ শতাংশ পরীক্ষার্থী ফেল করেছেন এ বিষয়ে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন গতকাল ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, পরীক্ষার খাতা শতভাগ নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকেও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ও পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছেন। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি এবং অভিভাবকদের যথাযথ নজরদারির অভাবও ফল খারাপের পেছনে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে তারা মনে করেন।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম সমকালকে বলেন, ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থাকা, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, বিজ্ঞান বিষয়ে কিছু শিক্ষার্থীর দুর্বলতা এবং গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধতা বড় কারণ।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ বলেন, এই বোর্ডের অধীন ১৫টি কলেজ থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। িতিন মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি কমানো এবং অভিভাবকদের যথাযথ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সর্বোচ্চ ফেল মানবিকে
এবার মানবিক বিভাগ থেকে ফেল করেছেন সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে ছাত্র ছিলেন দুই লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। এ ছাড়া ছাত্রী ছিলেন তিন লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন, সেখানে এক লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন পাস করেছেন। সব মিলিয়ে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক শিক্ষা বিভাগে এ হার ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
দিনাজপুর বোর্ডের সচিব অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভালো করেছে। তবে মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে ফল খারাপ হয়েছে। বোর্ডের ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের একজনও পাস করতে পারেনি। এটা মোট ফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ছাত্রদের ফল বেশি খারাপ
এবারের ফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের অকৃতকার্য হওয়ার হার বেশি। ছাত্রদের মধ্যে ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ ফেল করেছেন। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।