চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এখন শুধু উপাচার্য পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভাজন, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং উপাচার্য নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন।
অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, ক্যাম্পাসে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা রাত জেগে প্রধান ফটক পাহারা দেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশও সাবেক উপাচার্য সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হন।
অন্যদিকে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে নগরের সার্কিট হাউস থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানান।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—একজন উপাচার্যের নিয়োগ ও অপসারণকে কেন্দ্র করে চুয়েটে এমন অচলাবস্থা তৈরি হলো কেন?
৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তন
চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। চার বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৫৬ দিনের মাথায়, ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তবে তাকে কেন এত দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হলো, প্রজ্ঞাপনে তার কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
এরপর কুয়েটের সাবেক সহ-উপাচার্য ও ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
তৈরি হয়েছে কি দুটি বলয়?
উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চুয়েটে শিক্ষকদের মধ্যেও বিভাজনের চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
চুয়েট জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ফেসবুক গ্রুপে তার সঙ্গে মুজিব বর্ষ উদযাপনসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি প্রচার করে তাকে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে অধ্যাপক সায়েম সম্প্রতি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির যেসব ছবি প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের ছবি বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে একজন প্রতিমন্ত্রীর অনুসারী হিসেবে চুয়েট ছাত্রদলের নেতাদের একটি অংশ সমর্থন দিচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। চুয়েট ছাত্রদলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে তার পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, উপদল কিংবা গোষ্ঠীবিশেষের প্রতিনিধিত্ব করে না; এটি একটি সংবিধিবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা।’
তিনি বলেন, ‘ভিত্তিহীন রাজনৈতিক সমীকরণ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনুমানের অবতারণা কেন করা হলো, তা বিস্ময়কর। অহেতুক জল্পনা-কল্পনা না বাড়িয়ে যারা এসব নাম বা রাজনৈতিক অনুঘটক যুক্ত করেছেন, তাদের কাছ থেকেই সুনির্দিষ্ট কৈফিয়ত প্রত্যাশা করা সমীচীন।’
চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ এসব অভিযোগের কথা স্বীকার করে আন্দোলনকারীদের নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন করার অধিকার সবারই রয়েছে। কিন্তু এর কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করা বা ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখা কাম্য নয়।’
তার দাবি, আন্দোলনে যোগ না দেওয়া কিংবা নতুন উপাচার্যের কাছে দাবি-দাওয়া জানানো শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বিভিন্ন একাডেমিক গ্রুপ থেকে বাদ পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখেও পড়েছেন।
তবে নতুন উপাচার্যকে কোনো প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ হয়ে সমর্থন দেওয়া কিংবা সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন ওয়াসিফ রাশেদ।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আবেগের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। সব পক্ষের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
প্রশাসনের নজর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে
চুয়েটের চলমান পরিস্থিতিতে নতুন উপাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া এবং ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন।
৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতি, নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, চুয়েটের সার্বিক পরিস্থিতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্ত দেবে, স্থানীয় প্রশাসন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
তার ভাষায়, ‘ক্যাম্পাসে বর্তমানে এক ধরনের বিরোধ বা অসন্তোষের চিত্র দেখা যাচ্ছে। তাই কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন উপাচার্য প্রশাসনিক সহায়তা চাইলে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসন তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।’
বিভাগীয় কমিশনার জানান, নতুন উপাচার্য ৮ অক্টোবর ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও পরে তিনি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন।
শিক্ষক-কর্মকর্তারাও আন্দোলনে
বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে তালাবদ্ধ উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে কর্মবিরতি পালন করেন চুয়েটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে সাধারণ সভা শেষে শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে যোগ দেন।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আজ আমাদের একটি সাধারণ সভা ছিল। সেখানে আমরা সবাই আমাদের দাবির বিষয়ে একমত হয়েছি। চুয়েটের বাইরে থেকে কাউকে আমরা উপাচার্য হিসেবে চাই না।’
সায়েমকে ঘিরে এত সমর্থন কেন?
মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পরও অধ্যাপক সায়েমের পক্ষে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশের অবস্থান আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন।
চুয়েটের ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানেও তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। ১ সেপ্টেম্বরের ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু অধ্যাপক সায়েমের বিভিন্ন উদ্যোগ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
নতুন উপাচার্য, কিন্তু ক্যাম্পাস কোথায়?
২১ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়ার পরও অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এখনো ক্যাম্পাসে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেননি।
আন্দোলনকারীরা তার প্রবেশ ঠেকাতে প্রধান ফটকে পাহারা, লাল কার্ড প্রদর্শন, গ্রাফিতি এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। একপর্যায়ে তিনি অনলাইনে যোগদান করেন এবং নগরের সার্কিট হাউস থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানান।
তবে উপাচার্য ভবন তালাবদ্ধ থাকায় তার পক্ষে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিতরণ না করতে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখাকে নির্দেশ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন নতুন উপাচার্য। ঘটনার একদিন পর অবশ্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তিনি।