Image description

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজ। দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের এক আবেগ এবং আশার প্রদীপ এই কলেজ। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তির পর আবাসন সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে নিশ্চিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় অসচ্ছল বা নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের। শহরে থাকা-খাওয়ার উচ্চ ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা এখানে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর থাকে না। ফলে হলে একটি সিট তাদের জন্য শুধু একটি সুবিধা নয়, বরং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। তবে কলেজটির ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থীর কপালেই জোটে না সেই সিট নামের সোনার হরিণ।

তাদের একজন ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মিঠু দাস। বাবাকে হারিয়েছেন দুই মাস আগে। ব্যয়বহুল এই শহরে নিজের খরচ নিজে চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে ফুডপান্ডায় ডেলিভারির কাজ শুরু করেন তিনি। হলে একটি সিট পেলে হয়তো তার অনেক কষ্ট লাঘব হয়ে যেত। শুধু মিঠু দাসই নন, কলেজের এমন অনেক শিক্ষার্থীই আছেন, যারা আবাসন সংকটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি আয়-রোজগারের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

শিক্ষার্থী ১৯ হাজার, হলে সিট ১৩৬৪ কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক এবং অনার্স-মাস্টার্স মিলিয়ে সর্বমোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজারের বেশি। যার মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৪০০। অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। অন্যদিকে, উচ্চ মাধ্যমিক এবং অনার্স-মাস্টার্স মিলিয়ে কলেজের আটটি হলে সর্বমোট সিটের সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৩৬৪। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ৪৪২টি এবং অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ৯২২টি সিট।

কলেজের আটটি হলের মধ্যে পাঁচ তলাবিশিষ্ট বিজয় ২৪ হলটি সম্পূর্ণ বরাদ্দ দেওয়া হয় উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের, যেখানে মোট সিট সংখ্যা ১৬৬টি। অন্য সাতটি হলের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ হলে ৩২৮টি করে ৬৫৬টি সিট, দক্ষিণায়ন হলে ১৯২টি, আন্তর্জাতিকে ১৩৮টি, পশ্চিম হলে ৯৬টি এবং ফরহাদ হলে ১৬৬টি সিট রয়েছে। এ ছাড়া কলেজের ইলিয়াস হলটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় সেখানে সিট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।

প্রথম বর্ষে মেলে না সিট আবাসন সংকটের কারণে অনার্সের শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষ থেকেই হলের আসন পান না। ফলে ঢাকা শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসন নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েন। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে শহরের মেস বা হোস্টেলের ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাশেদুল রশিদ বলেন, কলেজে এসে জানতে পারি প্রথম বর্ষে নাকি হল সংকটের কারণে সিট দেওয়া হয় না। হলের সিট সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়, এখন ভবিষ্যতেও সিট পাব কি না তাও বুঝতে পারছি না।

অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, আমাদের হলে সিট অপর্যাপ্ত। ফার্স্ট ইয়ারে সিট দিলে সে তো পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে আর সিট ছাড়বে না তখন সিনিয়ররা বঞ্চিত হবে। তাদের প্রয়োজনটা অনেক বেশি। আগে শুধু থার্ড ইয়ার ফোর্থ ইয়ারে পেত। এবারই প্রথম ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সেকেন্ড ইয়ার থেকে সিট দিয়েছি।

দক্ষিণায়ন হলের প্রভোস্ট ও দর্শন বিভাগের প্রভাষক নাজমুল হাসান নয়ন বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক। মাত্র ৮% শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একটি ১০ তলা আবাসিক হল নির্মাণের কথাও রয়েছে। আমরা আশা করি, অতিদ্রুত নতুন হল নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

পরিত্যক্ত হল নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি এখনো

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজের আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস হলটি ১৯৯৩ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের জুলাই মাসে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মু. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে হলটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ছাত্রদের জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র স্থানান্তর করতে বলা হয়।

এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘হল খালি করার জন্য আমরা নোটিশ দিয়েছি, কিন্তু এখনো হলের নিচ তলায় কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে। হল খালি হয়ে গেলেই ভাঙার কাজ শুরু হবে। আমরা অলরেডি ডিসিকে হল ভাঙার জন্য চিঠি দিয়েছি।’

আবাসন সংকট নিরসনে নতুন একটা হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম এটা হবে। পরে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখি এটা একেবারেই হাওয়ার ওপরে।’

কালবেলা