রংতুলি, ক্যানভাস আর সৃজনশীলতার চর্চায় সমৃদ্ধ হওয়ার কথা থাকলেও নানা সংকটে ধুঁকছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদ। শিক্ষক সংকট, অপ্রতুল শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি, বাড়তি ব্যয় এবং দীর্ঘ সেশনজটে ব্যাহত হচ্ছে অনুষদটির শিক্ষা কার্যক্রম।
জানা গেছে, বর্তমানে অনুষদে মোট ২১ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে ভাস্কর্যে পাঁচজন, চিত্রকলা ও প্রাচ্যকলায় তিনজন করে এবং ছাপচিত্র, মৃৎশিল্প, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাসে দুজন করে শিক্ষক আছেন। অথচ এ অনুষদে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৭৮টি। ফলে ৫৭টি পদ শূন্য পড়ে আছে। এতে নিয়মিত পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষা ও পরীক্ষা পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা হলে দীর্ঘদিনের এই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
৭৮ পদের বিপরীতে ২১ শিক্ষক
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানান, চারুকলা আগে একটি বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি তিনটি বিভাগে আটটি ডিসিপ্লিন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ডিসিপ্লিনের আলাদা কোড, কারিকুলাম, ক্লাস, পরীক্ষা, ফলাফল ও ডিগ্রি রয়েছে। ফলে কার্যত প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমাদের ৭৮ জন শিক্ষক পদের বিপরীতে এখন কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। শিক্ষার্থীর অনুপাত বিবেচনায় প্রতিটি ডিসিপ্লিনে অন্তত ১৫ থেকে ১৮ জন শিক্ষক প্রয়োজন হলেও কোনো কোনো ডিসিপ্লিনে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন বা দুজন।
শিক্ষক সংকটে বাড়ছে সেশনজট
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারুকলার দীর্ঘ সেশনজটের প্রধান কারণ শিক্ষক সংকট। ব্যবহারিকনির্ভর শিক্ষা হওয়ায় প্রতিটি কোর্সে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কাজ শেখানো প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষক স্বল্পতার কারণে একই শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ ও কোর্সের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে অনুষদের ডিন বলেন, সেশনজটের মূল কারণ শিক্ষক সংকট। আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে চারুকলায় সেশনজট থাকার কথা নয়। তিনি জানান, ব্যবহারিক ও সেশনাল কোর্সের পরীক্ষা নিয়মিত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে অনেক সময় পরীক্ষার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয়।
বাড়তি ব্যয়ে চাপে শিক্ষার্থীরা
চারুকলার পড়াশোনা ব্যবহারিকনির্ভর হওয়ায় বিভিন্ন কোর্সে প্রয়োজন হয় নানা ধরনের উপকরণ ও সরঞ্জাম। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব উপকরণের বড় অংশই নিজেদের টাকায় কিনতে হয়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, তাত্ত্বিক পড়াশোনার উপকরণ লাইব্রেরি বা ইন্টারনেট থেকে পাওয়া গেলেও ব্যবহারিক কাজের উপকরণ শিক্ষার্থীদেরই কিনতে হয়। একটি কোর্সেই অনেক সময় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
শ্রেণিকক্ষ সংকটে বাইরে ক্লাস
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কখনো কখনো খোলা জায়গায়ও ক্লাসে বসতে হয়। একই শ্রেণিকক্ষ একাধিক ব্যাচ ব্যবহার করায় ব্যবহারিক ক্লাসের পরিবেশও ব্যাহত হয়।
এ নিয়ে এক শিক্ষার্থী বলেন, চারুকলায় জায়গা তুলনামূলক বড় হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ পাওয়া যায় না। কখনো বাইরে ক্লাস করতে হয়, আবার শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে কোনো কোনো ক্লাসও বন্ধ রাখতে হয়।
নেই স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি
চারুকলার শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারির অভাব। শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষই প্রদর্শনীর কাজে ব্যবহার করতে হয়।
শিক্ষার্থী মুনিম শাহারিয়া বলেন, আমরা শিল্পকর্ম তৈরি করি, কিন্তু সেগুলো প্রদর্শনের জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। গ্যালারির সংকটের কারণে নিয়মিত বার্ষিক প্রদর্শনী আয়োজন করা সম্ভব হয় না। একটি স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি চারুকলার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন সমস্যা আমরা চিহ্নিত করেছি। অবকাঠামোগত সংকট সমাধানে অনেক ক্ষেত্রে ইউজিসির বাজেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই আগামী বাজেটে বিশেষ বিবেচনার জন্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। এ নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে।
শিক্ষক সংকট নিয়ে তিনি বলেন, এক-দুই মাসের মধ্যে এটা অনেকটাই কমে আসবে। তবে অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
উপাচার্য আরো বলেন, পরীক্ষার সামগ্রী কেনার জন্য ১৫ লাখ টাকার একটি স্বল্পমেয়াদি বাজেট দেওয়া হয়েছে। তবে চারুকলার প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে আরো বড় বাজেট প্রয়োজন। এ বিষয়েও ইউজিসির মাধ্যমে অনুমোদন নিয়ে কাজ করতে হবে।
ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমি নিজে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উপকরণের সংকট দেখেছি। এটি একটি সৃজনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীরা আরো কিছু সহায়তা পেলে তারা ভালোভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।