চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) সংলগ্ন স্থানীয় জোবরা গ্রামের ক্ষণিকালয় নামে মেয়েদের আবাসিক কটেজে গিয়ে এক বাড়িওয়ালা নারীর সাথে মব তৈরির নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের ২২-২৩ সেশনের আশিকুর রহমান নামের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ওই নারী গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গণমাধ্যমকে তার সাথে হওয়া অপ্রীতিকর বিষয়গুলো তুলে ধরেন। ভুক্তভোগী নারীর নাম মুক্তার বেগম মুক্তা (৪৩)। তিনি চবির লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০০১-২০০২ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। ক্যাম্পাসের পাশেই জোবরা গ্রামে থাকেন তিনি। সেখানে একটি ছাত্রীনিবাস পরিচালনা করেন।
সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী, তার স্বজন ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, চবির ইসলামিক হিস্ট্রি বিভাগের ২৫-২৬ সেশনের এক শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়েদের কটেজে (ছাত্রী নিবাস) গিয়ে ২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী আশিকের নেতৃত্বে একদল যুবক অপ্রীতিকর ভাষায় কথাবার্তাসহ ভুক্তভোগী নারীকে থাপড়ানোর হুমকি দেয়। পরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওই ভুক্তভোগী নারী চবি প্রক্টরকে বিষয়টি অবহিত করেন।
এ নিয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে এক সালিশে অভিযুক্তদের অন্যান্য সদস্য উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন মবের নেতৃত্বে অভিযুক্ত আশিকুর রহমান।
ভুক্তভোগী মুক্তার বেগমের (৪৩) দাবি, গত ১০ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) বেলা ২-৩টার দিকে আনুমানিক ১২-১৫ জনের একদল ছেলে আমার বাড়িতে আসে। ছেলেগুলো অপরিচিত হওয়ায় ভুক্তভোগী নারী বাহিরে না আসায় নেতৃত্বদানকারী যুবক বলেন ‘আমরা প্রক্টর এবং ভয়েস অফ স্টুডেন্টসের পক্ষ থেকে আসছি’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী ও চবি শিক্ষার্থী দাবি করে বলেন, এরপর ডাক শুনে ভুক্তভোগী বাড়িওয়ালা বাহিরে না আসায় ভয়েস অব স্টুডেন্টস নামক সংগঠনের সভাপতি আশিক বলেন ‘এ সমস্ত বাড়িওয়ালাদের থাপড়ানো উচিত, এরা অনেক বেড়ে গেছে।’
নাম অপ্রকাশ রাখার শর্তে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ২১-২২ সেশনের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানে ১০-১২ জনের একটা গ্রুপ এসেছিল, প্রথমে চিনতে পারিনি তারা কে, পরে জানতে পারি আশিক নামের এক শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে বাড়িওয়ালাকে ডাকা হচ্ছিল। সে চিল্লাচিল্লি করতেছিল এবং বলতেছিল এ মহিলাকে বের করেন, তারপর বলল এই মহিলাকে থাপড়াবো।’
আক্ষেপ নিয়ে চবির সাবেক এই ভুক্তভোগী ছাত্রী মুক্তা বলেন, আমি এক সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। এখন আমার মেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং ছাত্রী। আমি শঙ্কিত, সামনের দিনে তার সাথে এমন কিছু হলে এর নিরাপত্তা দেবে কে?
তিনি আরও বলেন, এভাবে যদি সাবেক চবিয়ানদের ওপর মব সৃষ্টি করে মারধরের চেষ্টা করা হয়, তাহলে চবির একজন সাবেক হিসেবে আমি লজ্জিত। সেদিন আমার ইচ্ছে হচ্ছিল আমার সকল সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলি। সেদিন আমি নিজেই সুইসাইড এটেম নিয়েছিলাম, আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। আমার সন্তানেরা আমার গায়ে হাত দিবে, এটিই কি আমার সন্তানদের শিক্ষা?
মবের নেতৃত্বে অভিযুক্ত আশিকুর রহমান সহকারী প্রক্টরের পারমিশন ছাড়া সেখানে যাননি দাবি করে গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে বলেন, আমাকে সহকারী প্রক্টর কামরুল ইসলাম স্যার পাঠিয়ে বলেছিলেন, তুমি যাও গিয়ে জিজ্ঞেস করো অভিযোগগুলো সত্য কি-না?
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভয়েস অব স্টুডেন্টস-এর পক্ষ থেকে যাই নি, মেয়েটিকে পারসোনাল হেল্প করার জন্য গিয়েছিলাম।’
মুঠোফোনে অভিযুক্ত আরও বলেন, ব্যক্তি আশিক হিসেবে সেখানে গিয়েছি, ক্যাম্পাসে আমার একটা পরিচিতি আছে না। ব্যক্তি আশিককে সবাই চিনে, জুলাইয়ের যোদ্ধা, জুলাইয়ের সমন্বয়ক, ক্যাম্পাসের একজন অ্যাকটিভিস্ট, একটা সংগঠনের প্রেসিডেন্ট। প্রত্যেকটি নামের সাথে পরিচিত না আমি। তাই ব্যক্তি আশিক সেখানে যায় না।
ভুক্তভোগী নারীর বাড়িতে গিয়ে ‘প্রক্টরের পক্ষ থেকে এসেছি’ বলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আশিক বলেন, প্রক্টর স্যার পুলিশ পাঠাতে চেয়েছিল, আমরা পুলিশ আনি নাই। ফোন দিয়ে সহকারী প্রক্টর কামরুল স্যারকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে। আমাদের প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দায়ের করতে বলেছিলাম তাদের। যাতে করে বাহিরের পুলিশ-প্রশাসনের মাধ্যমে সমন্বয় করে বিষয়টি সমাধান করতে পারি। এরপর কি হয়েছে জানি না।’
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. হোসেন শহিদ সরওয়ার্দীকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। তবে ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় প্রক্টর অফিসের এক সালিশে তিনি বলেন, ‘হো ইজ আশিক, তাকে কে অথরিটি দিয়েছে আমার এক শিক্ষার্থীর রেস্পনসিবিলিটি নিতে?’