Image description

দেশের শিক্ষাকাঠামোয় একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ১ জুলাই। একাদশ ও দ্বাদশ দুই শ্রেণি মিলিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করা হয় ২৪ মাসে। ২০ মাস চলে ক্লাস, বাকি চারমাসে নেওয়া হয় নির্বাচনি ও বোর্ড পরীক্ষা।

এবার একাদশে ক্লাস শুরুর আগেই প্রায় তিনমাসের সেশনজটে পড়তে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অথচ শিক্ষামন্ত্রী সামনের বছরগুলোতে এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে ২০২৮ সালে যারা এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন, তারা ক্লাস ও প্রস্তুতিতে সময় কম পাওয়ার আশঙ্কা করছেন।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে এনে ‘সেশন গ্যাপ’ কমানোর কথা বলছেন। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টো। এবার কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই। তারপরও ভর্তি ও ক্লাস শুরু হতে দেরি হচ্ছে। পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় এগিয়ে আনার কথাও বলা হচ্ছে। এতে প্রস্তুতি ঘাটতি থাকবে। খারাপ হতে পারে ফল।

তবে তিনমাস দেরিকে ‘খুব বেশি সমস্যা’ হিসেবে দেখছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। বোর্ড কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতির পর এবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একাদশের ক্লাস শুরু করতে হচ্ছে। ওই সময়ের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। আগামীতে ধীরে ধীরে ভর্তি ও ক্লাস শুরুর সময় এগিয়ে আনা হবে।’

 

এসএসসির ফল প্রকাশে দেরি, ভর্তিতেও বিলম্ব

এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা ছিল ২০ জুলাইয়ের মধ্যে। অথচ ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবার ৮২ দিনের মাথায় ১০ আগস্ট ফল প্রকাশ হয়। ফল প্রকাশের ২২ দিন পর ২ সেপ্টেম্বর শুরু করা হয়েছে ভর্তির আবেদন। তড়িঘড়ি ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ক্লাস শুরুর দিনক্ষণ গড়াচ্ছে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্যমতে, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি আবেদন নেওয়া হবে। তবে পুনর্নিরীক্ষণে ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হবে ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর।

কোন শিক্ষার্থী কোন কলেজে মনোনীত হলেন, সেই ফল প্রকাশ করা হবে ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায়। ফল প্রকাশের পর নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চায়নের জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

 

নিশ্চায়ন প্রক্রিয়া শেষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে। ভর্তি চলবে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সব প্রক্রিয়া শেষে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে ২৩ সেপ্টেম্বর। এরপরও কোনো শিক্ষার্থী ভর্তির আওতার বাইরে থাকলে তাদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হবে। ফলে পুরোদমে ক্লাস শুরু করতে পেরিয়ে যাবে সেপ্টেম্বর মাসও।

বিগত ১০ বছরে একাদশে ক্লাস শুরু হয়েছিল কবে

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির আগের বছরগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে একাদশ শ্রেণিতে ঘটা করে সারাদেশে একযোগে ক্লাস শুরু করা হতো। ২০১৭ সালের ১ জুলাই একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয়েছিল। ২০১৮, ২০১৯ সালেও ১ জুলাই একাদশের ক্লাস শুরু করা হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর ২০২০ সালে একাদশের ক্লাস শুরুর তারিখ পিছিয়ে যায়। সে বছর ৪ অক্টোবর অনলাইনে ক্লাস শুরু করা হয়। ২০২১ ও ২০২২ সালেও করোনার ধাক্কা একাদশের ক্লাস শুরুর সময় পুরো এলোমেলো করে দেয়। ২০২১ সালের একাদশের ক্লাস ২০২২ সালের ২ মার্চ এবং ২০২২ সালের ক্লাস শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।

২০২৩ সাল থেকে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে শুরু করে। ওই বছর ৮ অক্টোবর একাদশে ক্লাস শুরু করা হয়। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের কারণে ২১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১১ আগস্ট ক্লাস শুরু হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে এসএসসি পরীক্ষা পেছানোয় ২০২৫ সালেও কিছুটা দেরিতে একাদশে ক্লাস শুরু হয়। সে বছর ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু করা হয় ক্লাস। অথচ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা কিছুটা এগোলেও একাদশের ক্লাস শুরু আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাপঞ্জি অনুসরণে লেজেগোবরে শিক্ষাপ্রশাসন

শুধু একাদশে ক্লাস শুরু নয়, শিক্ষাপঞ্জি অনুসরণ করে শিক্ষাকাঠামো ঠিক রাখতে শিক্ষাপ্রশাসন লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও তা নেওয়া হয় ২০২৬ সালের এপ্রিলে। এতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারমাস লেখাপড়া করার পর পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ওপর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষাপঞ্জি যে খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে, সেটা মনে করি না। অতীতে এর চেয়েও বিশৃঙ্খল ছিল। বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সবকিছু শিক্ষাপঞ্জি মেনে শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে।-মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল 

বন্যা পরিস্থিতির কারণে এবার এইচএসসি পরীক্ষাও পেছায়। এতে ফল প্রকাশে সময় লাগতে পারে নভেম্বর পর্যন্ত। পিছিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও। একই সঙ্গে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা ‍শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১৪ মার্চ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষাপঞ্জি যে খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে, সেটা মনে করি না। অতীতে এর চেয়েও বিশৃঙ্খল ছিল। বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সবকিছু শিক্ষাপঞ্জি মেনে শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে।’

শিক্ষার্থীরা হিমশিম, অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন

প্রস্তুতির সময় কমিয়ে পরীক্ষা এগিয়ে আনায় সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সেশনজটে পড়লে সেই জটিলতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তারা। তাদের এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও।

এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন শাকিব শাহরিয়ার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফল প্রকাশে দেরি, এখন ভর্তিতেও দেরি। ক্লাস শুরু হচ্ছে বলতে গেলে অক্টোবরে। কিন্তু আমরা যখন এইচএসসি পরীক্ষা দেবো, তখন দেখা যাবে এপ্রিলে পরীক্ষা শুরু করা হবে। তাহলে আমরা শুরুতে তিনমাস কম পেলাম। আবার ওদিক থেকেও তিনমাস কম পাবো। মাত্র ১৬-১৭ মাস প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। অন্য বছরের শিক্ষার্থীরা ২০ মাস পেলেও আমাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হতে পারে।’

শিক্ষামন্ত্রী বলছেন পরীক্ষা এগিয়ে আনা হবে। পরীক্ষা যদি এগিয়ে আনা হয়, তাহলে ক্লাস শুরুও দ্রুত করা উচিত। যেহেতু দেরিতে ক্লাস শুরু হচ্ছে, সেদিক বিবেচনা করে প্রস্তুতিতে যথেষ্ট সময় দেওয়া উচিত হবে।-শিক্ষার্থীর অভিভাবক

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল শাখার শিক্ষার্থীর মা অন্তরা পারভীনও একই আশঙ্কার কথা জানান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী বলছেন পরীক্ষা এগিয়ে আনা হবে। পরীক্ষা যদি এগিয়ে আনা হয়, তাহলে ক্লাস শুরুও দ্রুত করা উচিত। যেহেতু দেরিতে ক্লাস শুরু হচ্ছে, সেদিক বিবেচনা করে প্রস্তুতিতে যথেষ্ট সময় দেওয়া উচিত হবে।’

শিখন ঘাটতি রেখে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার আশঙ্কা

দেরিতে ক্লাস শুরু করা এবং দ্রুত পরীক্ষা নিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় শিক্ষার্থীদের বিরাট শিখন ঘাটতি থেকে যাবে বলে মনে করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রশাসনের কর্মকর্তারা পরীক্ষা নেওয়ায় বেশি আগ্রহী। শিক্ষার্থীরা কতদিন ক্লাস করলো, ক্লাসে কী কী শিখলো, তা তাদের কাছে বিবেচ্য হয় খুবই কম। তাদের লক্ষ্য থাকে দ্রুত শিক্ষাবর্ষটা শেষ করা।’

তিনি বলেন, ‘এ কারণে ফল বিপর্যয় ঘটে। অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রীও ফল খারাপ করে ঝরে পড়ে। শিখন ঘাটতি রেখে এভাবে তড়িঘড়ি শিক্ষাবর্ষ শেষ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বাভাবিক শিক্ষাপঞ্জিতে ফিরতে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হুট করে এগিয়ে আনলে একটি বা দুটি বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি কাম্য নয়।’

‘খুব বেশি সমস্যা’ দেখছে না শিক্ষা বোর্ড

এবার যারা একাদশে ভর্তি হবে, তারা ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। মাঝে প্রায় ২০-২২ মাস সময়। এর মধ্যে পরিকল্পনামাফিক ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হলে সময় নষ্ট না করে পাঠ শেষ করা সম্ভব হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের সামনে লম্বা সময় থাকবে, তারাও সে লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারবে।-বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান

তিনমাস দেরিকে ‘খুব বেশি সমস্যা’ হিসেবে দেখছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আমরা ভর্তিপ্রক্রিয়া এগিয়ে এনেছি। ফলে এবার খুব বেশি দেরি হচ্ছে না। যেটুকু দেরি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে প্রস্তুতির ঘাটতি হবে কি না, এমন প্রশ্নে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘২০২৭ সালে আমরা ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা করেছি। পরবর্তী বছর অর্থাৎ, ২০২৮ সালে এটা কিছুটা এগোতে পারে।’

এবার যারা একাদশে ভর্তি হবে, তারা ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে জানিয়ে বলেন, ‘মাঝে প্রায় ২০-২২ মাস সময়। এর মধ্যে পরিকল্পনামাফিক ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হলে সময় নষ্ট না করে পাঠ শেষ করা সম্ভব হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের সামনে লম্বা সময় থাকবে, তারাও সে লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারবে।’