উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় একবার ব্যর্থ হলেই অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। দেশের শীর্ষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রতিবছরই এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হন হাজারো ভর্তিচ্ছু। অন্যদিকে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট শর্তে ‘সেকেন্ড টাইম’ চালু রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নীতিতে এমন বৈষম্য কেন? উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে কি অভিন্ন নীতি থাকা উচিত নয়?
যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই ‘সেকেন্ড টাইম’
কয়েকটি শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, গুচ্ছভুক্ত ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) এবং কৃষি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মোট নম্বর থেকে ৩ নম্বর কাটা হয়। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) ৫ শতাংশ নম্বর কর্তনের বিধান রয়েছে। একইভাবে সরকারি মেডিকেল, ডেন্টাল ও আর্মি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায়ও দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণকারীদের ৩ নম্বর কাটা হয়।
বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থী, অগ্রাহ্য মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতা
এদিকে দেশের বেশ কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে ‘সেকেন্ড টাইম’ বা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী। তাদের ভাষ্য, উচ্চমাধ্যমিকের পর অনেক সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা হয়ে; ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো করার সুযোগ থাকে না। আবার পারিবারিক, মানসিক কিংবা আর্থিক নানা কারণেও প্রথমবার প্রত্যাশিত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু পরের বছর আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েও কেবল নীতিগত কারণে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে হচ্ছে। এতে আগ্রহ, মেধা ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে চান্স না পাওয়া আব্দুল্লাহ আল মাসুম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘একবার খারাপ ফল বা খারাপ পরীক্ষা মানেই একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। দ্বিতীয় সুযোগ থাকলে হয়তো নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেতাম।’ বাধ্য হয়েই বর্তমানে মাসুম একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।
উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পারিবারিক, আর্থিক, শারীরিক কিংবা মানসিক নানা কারণে একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পাসের পরপরই ভর্তি হতে নাও পারেন। পরে যদি তিনি প্রস্তুতি নিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার যৌক্তিকতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের মতো বয়সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে বিভিন্ন বয়স ও অভিজ্ঞতার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। তাই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগও আরও উন্মুক্ত হওয়া উচিত।—অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থীদের দাবি
দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ চালুর দাবিতে প্রতিবছরই আন্দোলনে নামেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত প্রচারণা চালান তারা। তাদের অভিযোগ, একবার কাঙ্ক্ষিত ফল না করতে পারলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে একটি বছর অপেক্ষা করেও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ মেলে না। তাদের মতে, অসুস্থতা, মানসিক চাপ কিংবা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে অনেকেই প্রথমবার ভালো করতে পারেন না। কিন্তু দ্বিতীয়বার সুযোগ না থাকায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের আর কোনো সুযোগ পান না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু তাসনিম ফারিহা বলেন, প্রথমবার খুব অল্প ব্যবধানে সুযোগ পাইনি। আবার প্রস্তুতি নেওয়ার মানসিকতা ছিল, কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই নেই। একটি পরীক্ষাই যেন পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। সেকেন্ড টাইম থাকলে প্রতিযোগিতা আরও ন্যায্য হতো।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু সাফিন হাসান বলেন, এক বছর কঠোর পরিশ্রম করার পরও শুধু ব্যাচভিত্তিক নিয়মের কারণে পরীক্ষা দিতে না পারাটা হতাশাজনক। আমরা চাই, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।
কেন সুযোগ রাখে না কিছু বিশ্ববিদ্যালয়
দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ না রাখার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাদের মতে, প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভর্তি জালিয়াতির ঝুঁকি কমানো এবং ভর্তি শেষে আসন শূন্য হওয়ার মতো প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতেই এ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, কোনো শিক্ষার্থী একবার ভর্তি হওয়ার পর পরের বছর আবার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আগের প্রতিষ্ঠানে আসন শূন্য হয়ে যায়। এতে ভর্তি কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে একাধিকবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকলে নতুন পরীক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতাও কঠিন হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড টাইম ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এটি আমার একক সিদ্ধান্ত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ডিসিশন এটি। এটা যারা আগে বন্ধ করেছেন নিশ্চয় কোন কারণে করেছেন, সেটা এখন দেখার বিষয়। যখন এই সিদ্ধান্ত হয় তখন আমি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ছিলাম। তিনি আরও বলেন, ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বডি কাজ করে, সেসব বডির সাথে এখন আমি আলাপ করবো। যদি সম্ভব হয় কোনোভাবে ফিরিয়ে আনা যায় কিনা সেটা নিয়ে আমি কথা বলে দেখব। কিন্তু এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব না। এটি বড় একটা ডিসিশন।
যেভাবে বন্ধ হয়েছিল ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণের সুযোগ
গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার (সেকেন্ড টাইম) সুযোগ নিয়ে একাধিকবার নীতিগত পরিবর্তন এসেছে। কোথাও এ সুযোগ বাতিল করা হয়েছে, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা পুনর্বহাল করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৪–১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বাতিল করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এ নীতি গ্রহণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে একই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত ভর্তি নীতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে সমন্বিত প্রকৌশল গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা চালু হওয়ার পর কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েট যৌথভাবে নতুন ভর্তি কাঠামো গ্রহণ করে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়েও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ রাখা হয়। প্রশাসনের ব্যাখ্যায় বলা হয়, সমন্বিত ব্যবস্থায় সব প্রার্থীর জন্য একই ধরনের প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের সঙ্গে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। তবে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন, দাবি এবং প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর পাঁচ বছর পর ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষে এ সুযোগ পুনরায় চালু করা হয়। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে করোনা মহামারির প্রভাব, শিক্ষার্থীদের দাবি এবং ভর্তি নীতির পুনর্মূল্যায়নের পর ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও সেকেন্ড টাইম চালু করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ২০২২ সালে একাডেমিক কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বাতিলের প্রাথমিক প্রস্তাব ওঠে। তবে শিক্ষার্থীদের মতামত ও নীতিগত পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
‘ভারত, চীন ও জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে একটি পরীক্ষার ফল কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়।’
আন্তর্জাতিক চিত্র
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ (সেকেন্ড টাইম) নিয়ে বিতর্ক চললেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির নীতিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অধিকাংশ দেশেই ব্যর্থ হওয়ার পর আবার চেষ্টা করার সুযোগ কোনো না কোনোভাবে উন্মুক্ত রয়েছে, যদিও তার কাঠামো ও শর্ত ভিন্ন।
জাপানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক—দুই ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। অনেকেই এক বা একাধিক বছর সময় নিয়ে প্রস্তুতি নেন, যাদের ‘রোনিন’ নামে আলাদা পরিচয়ও রয়েছে। এটি দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় একটি পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা।
চীনে উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা ‘গাওকাও’ (Gaokao)। এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর অংশ নিতে পারেন। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে পরবর্তী বছর আবারও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে, যা সেখানে একটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ায়ও একই ধরনের কাঠামো বিদ্যমান। দেশটির জাতীয় কলেজ স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (CSAT) প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পরবর্তী বছরে উন্নত ফল অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন।
ভারতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হয় একাধিক জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রকৌশল শিক্ষায় JEE Main ও JEE Advanced, চিকিৎসা শিক্ষায় NEET এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে CUET-এর মতো পরীক্ষাগুলো ব্যবহৃত হয়। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলে শিক্ষার্থীরা সাধারণত পরবর্তী বছর আবার এসব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। কিছু পরীক্ষায় নির্দিষ্ট এটেম্পট লিমিট থাকে।
পাকিস্তানে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা অথবা হাইয়ার এডুকেশন কমিশন (HEC)-এর অনুমোদিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সাধারণত পরের বছর আবার আবেদন ও ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। ফলে একবার ব্যর্থ হলেও পরবর্তী বছরে পুনরায় চেষ্টা করার সুযোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্মুক্ত থাকে।
‘উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগও আরও উন্মুক্ত হওয়া উচিত’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তার ভাষায়, পারিবারিক, আর্থিক, শারীরিক কিংবা মানসিক নানা কারণে একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পাসের পরপরই ভর্তি হতে নাও পারেন। পরে যদি তিনি প্রস্তুতি নিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের মতো বয়সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে বিভিন্ন বয়স ও অভিজ্ঞতার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। তাই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগও আরও উন্মুক্ত হওয়া উচিত।
সেকেন্ড টাইম বন্ধ রাখার পেছনে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করলেও এর বিকল্প সমাধানের কথা বলেন তিনি। তার মতে, কোনো শিক্ষার্থী একবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করা যেতে পারে। এতে আসন শূন্য হওয়ার সমস্যা কমবে, আবার যোগ্য শিক্ষার্থীরাও দ্বিতীয়বার প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবেন।
মজিবুর রহমানের ভাষায়, ভারত, চীন ও জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে একটি পরীক্ষার ফল কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়।