ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ডাকসু) গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সমন্বয়ক ও ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের ভিপিপ্রার্থী আব্দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ডাকসুর গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। অনেকেই মনে করছে, ছাত্রশিবির আত্মপ্রকাশ করতে না পেরে ডাকসুর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করছে।
আজ শনিবার ( ১৬ মে) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এমন মন্তব্য করেনি তিনি।
আব্দুল কাদের অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে যখনই সুযোগ হয়েছে, যারা ক্ষমতায় থেকেছে তারা আবার সবকিছু নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিতে চেয়েছে। আমরা যখন ব্যস্ত ছিলাম রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো কেমন হবে, সেটা নিয়ে, তখন একটি গোষ্ঠী খুব অর্গানাইজডভাবে হলে হলে সিট দখল শুরু করে। তারা খুব ওয়েল অর্গানাইজড ছিল।
‘‘আপনারা অনেকে জানেন, ওই সময় যারা সমন্বয়ক ছিল, তাদের কী পরিস্থিতির মধ্যে যেতে হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে যেমন ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার নামে তারা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে, তারা ভেবেছিল ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও একইভাবে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা দেখেছি, জুলাইকে কাজে লাগিয়ে, শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতি ব্যবহার করে, ধর্মীয় বিষয় ব্যবহার করে তারা আধিপত্য বিস্তারের একটা মেকানিজম তৈরি করেছে।’’
তিনি আরও বলেন, পরে ক্যাম্পাসে আলাপ হলো—ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, রাতের বেলা ক্যাম্পাসে অসুস্থ রাজনীতির সব মেকানিজম আবার চালু করা হয়েছে। ১০ তারিখ অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর আমরা দেখলাম, বিপ্লবী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাবেল আহমদ জুবেলকে হল থেকে বের করে দেওয়া হলো—কারণ তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কেউ হলে থাকতে পারবেন না। আমি নিজেও সমন্বয়ক ছিলাম। তিন মাস ভয়ে হলে উঠতে পারিনি। কারণ ক্যাম্পাসে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম—দলীয় ভিসি দেওয়া যাবে না। কিন্তু পরে আমরা দেখলাম, যিনি ভিসি হয়েছেন, যিনি প্রক্টর হয়েছেন—তাদের দলীয় পরিচয় আছে।
সাংগঠনিক পরিচয়ের কারণে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি হলে থাকতে পারেনি অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম, জুলাই-পরবর্তী সময়ে একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু তার উল্টোটা হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলা হলেও, পরে দেখা গেছে যারা এগুলো বলছিল, তারাই বিভিন্ন জায়গায় শিবিরের কমিটিতে আছে।
‘‘কেউ কথা বলতে গেলেই তাকে ‘প্রগতিশীল’, ‘ধর্মবিদ্বেষী’, ‘জুলাইবিরোধী’ ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এই কালচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে একজন নারীকে হেনস্তা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু তখন অনেকে ব্যস্ত ছিল—কীভাবে প্রক্টর বসানো যায়, কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের লোক বসানো যায়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা হাতছাড়া করতে চায়নি।’’
সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ ভিন্নমত দিলেই তাকে ধর্মবিদ্বেষী বা অন্য ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। আমি নিজে এর শিকার হয়েছি। আমার পরিবারকে নিয়ে নোংরামি করা হয়েছে। আমার মায়ের ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার করা হয়েছে। সেই ট্রমা আমি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আগে ছাত্রলীগ পিটিয়ে দমন করত, এখন মানসিকভাবে হেনস্তা করে দমন করা হয়। এটাই নতুন বাস্তবতা।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি দাবি করে তিনি বলেন, পাঁচ-সাত বছর আগে আমরা যখন শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হতাম, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা দূরে সরে থাকত। আমার বন্ধুরাও কথা বলত না। তারা ভয় পেত। ৫ আগস্টের পরও সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তারা নিজেদের এজেন্সি অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু এই কালচারের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়ায়নি। আমাদের অবশ্যই মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। শিবিরেরও মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে—ছাত্রদের জীবনকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। একইসাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। শিক্ষকদেরও ভাবতে হবে—তারা শিক্ষার্থীদের রক্ত, শ্রম, ত্যাগের বিনিময়ে এখানে বসে আছেন। তারা যদি নিজেদের স্বার্থ বা যারা বসিয়েছে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন, তাহলে পরিবর্তন আসবে না।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারেক রহমান, আমাদের প্রধানমন্ত্রী। ক্যাম্পাসে এসে বলেছেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতির মূল কারণ রাজনৈতিক নিয়োগ। কিন্তু আমরা এখনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেখছি। আমরা তো চেয়েছিলাম, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আগের সেই দলদাস সংস্কৃতি বন্ধ হবে। কিন্তু সেটা এখনো চলছে।