রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ক্যাবলসের প্রায় ৮৯১ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদের হিসাব মেলেনি। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ১৫ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যিক পাওনার একটি বড় অংশ আদৌ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনার্স। সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি, বছরের পর বছর ধরে অনাদায়ি পাওনা, শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে অনিয়ম এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান না মানার মতো নানা বিষয় উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এই অর্থবছরে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪২৪ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশও সুপারিশ করা সম্ভব হয়নি।
সম্পদের হিসাবে গরমিল
ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেডের (ইসিএল) আর্থিক প্রতিবেদনে নিজস্ব জমি ছাড়াও ৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ ৮৪ হাজার ১৭৬ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কারখানা, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি। কিন্তু নিরীক্ষকরা এই সম্পদের সত্যতা যাচাই করতে পারেননি। সম্পদে কোনো শনাক্তকরণ ট্যাগ নেই, রেজিস্টারও অসম্পূর্ণ। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-৩৬ অনুযায়ী সম্পদের মূল্য হ্রাস বা বৃদ্ধির কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে সম্পদগুলো আদৌ অক্ষত আছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হদিস নেই দেনাদারদের
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইসিএলের মোট বাণিজ্যিক পাওনা ১৫ কোটি ৬ লাখ ১৪ হাজার ১৭৪ টাকা। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৬ টাকা গত কয়েক বছর ধরে অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে। এই টাকা আদৌ আদায় হবে কি না, তা যাচাই করতে নিরীক্ষকরা দেনাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া ১৬টি ঠিকানায় চিঠি পাঠান। সবকটি চিঠিই ‘ঠিকানা ভুল’ বা ‘প্রাপক নেই’ হিসেবে ফেরত এসেছে।
আরও এক কোটি ৬১ লাখ তিন হাজার ৯৫৩ টাকা পাওনা দেখানো হয়েছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের অধীন বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও কারখানার কাছে; যেগুলো ইতিমধ্যেই সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে। কত বছর ধরে এই টাকা বকেয়া, কোন প্রকল্পের কাছে কত পাওনা, এমন কোনো কাগজপত্র নিরীক্ষকদের দেওয়া হয়নি। সময়ভিত্তিক কোনো বিশ্লেষণও (এজিং অ্যানালাইসিস) করা হয়নি। এসব টাকা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, আবার হিসাবের খাতা থেকেও বাদ দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল হালিম। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পাওনা টাকার যে হিসেবে গরমিল সেটা নিয়ে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে। আগামী ৫ মে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি পেলে বিস্তারিত বলতে পারব।’
শ্রমিকের স্বার্থেও অনিয়ম
গ্র্যাচুইটি তহবিলেও বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে। কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনে গ্র্যাচুইটি দায় দেখিয়েছে ১৭ কোটি ৮৭ লাখ ২১ হাজার ৭১৪ টাকা। অথচ প্রকৃত দায় ২৩ কোটি ৬৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৯৮ টাকা। অর্থাৎ ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৪ টাকা দায় কম দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে কোম্পানির প্রকৃত লোকসানও কম দেখানো হয়েছে। আইএএস-১৯ অনুযায়ী রিপোর্টিং সময়সীমার মধ্যে গ্র্যাচুইটি দায়ের অ্যাকচুয়ারি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক হলেও তা করা হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিধি অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি তহবিলের প্রতি বছর নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতাও পালন করেনি ইসিএল।
প্রভিডেন্ট ফান্ডেও একই চিত্র। আর্থিক বিবরণীতে প্রভিডেন্ট ফান্ডের দায় দেখানো হয়েছে এক কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার ১০৯ টাকা। শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী, মাসিক চাঁদাপরবর্তী মাসের ১৫ দিনের মধ্যে ফান্ডে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইসিএল তার প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে দেওয়া ঋণ বাবদ ৪ কোটি ৪০ লাখ ৬৬ হাজার ৩০৩ টাকা উদ্ধার করলেও ফান্ডে ফেরত দেয়নি। ২০২২ সালের পর থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আর কোনো নিরীক্ষা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের যথার্থতাও যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষকরা।
আরও যত অনিয়ম
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিধি অনুযায়ী, শেয়ারহোল্ডারদের অবণ্টিত লভ্যাংশের দুই কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৫ টাকা ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করা বাধ্যতামূলক। ইসিএল তা করেনি।
বিলম্বিত করের হিসাবও আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১২ অনুযায়ী করা হয়নি। করের মোট পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যাও নিরীক্ষকদের দেওয়া হয়নি। ফলে শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানির প্রকৃত কর দায় এবং ভবিষ্যতের কর পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না।
গুদামের মজুত পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও আইএএস-২ মানা হয়নি। এই মান অনুযায়ী ক্রয়মূল্য ও বর্তমান বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি কম, সেটি ধরার নিয়ম। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে খুচরা যন্ত্রাংশ ও বিবিধ জিনিসপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে তিন কোটি ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৮০১ টাকা। নিরীক্ষকরা সরেজমিনে গুদামে গিয়ে এসব পণ্যের একটি বড় অংশই খুঁজে পাননি। বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার বা বিক্রি না হওয়া পণ্যও তালিকায় রয়ে গেছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ বাস্তবতার চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে ইসিএলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মালেক মোড়লের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এশিয়া পোস্ট। তবে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।