চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন পরীক্ষকরা। এর ফলে যথা সময়ে ফল প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তায় তৈরি হয়েছে। উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নম্বর আপলোডসহ নানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না; তা নিয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর নেপথ্যে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এসেছে। যদি তাদের অভিযোগের যৌক্তিকতা নেই বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
এসএসসির খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাতা মূল্যায়নে সম্মানী কম দেওয়া হয়। যে সম্মানী দেওয়া হয় সেটি পেতেও প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয় তাদের। এছাড়া পরীক্ষার খাতা সংশ্লিষ্ট বোর্ড থেকে নিয়ে আসা এবং জমা দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। এই কাজ করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি চাইলেও দেওয়া হয় না। প্রতি পরীক্ষককে ২০০ থেকে ২৫০টি খাতা মূল্যায়নের জন্য দেওয়া হয়। এসব কারণে মূলত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনীহা তৈরি হয়েছে।
যদিও শিক্ষকদের এ দাবির সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে শিক্ষকদের সম্মানী পরিশোধ করা হয়। এছাড়া খাতা মূল্যায়নের সম্মানীও বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিক্ষকদের দাবির যৌক্তিকতা নেই।
এসএসসির বাংলা প্রথম পত্রের খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া ২৩৫ পরীক্ষক খাতা নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা খাতা সংগ্রহ করেননি। পরে বাধ্য হয়ে গত মঙ্গলবার ২৩৫ পরীক্ষকের তালিকা প্রকাশ করে শিক্ষা বোর্ড। তালিকা প্রকাশের পূর্বে গত ৩০ এপ্রিল মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে খাতা সংগ্রহের কথা জানানো হলেও তারা খাতা সংগ্রহ করেননি।
জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘গত বছর এসএসসির প্রতিটি খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের সম্মানী ৩৫ টাকা ছিল। এবার ১০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকা করা হয়েছে। ফলে সম্মানী কমের বিষয়টি সঠিক নয়। যাদের সম্মানী পেতে বিলম্ব হয়, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত ঝামেলা থাকে। এটি সমাধান না করায় সম্মানী পেতে বিলম্ব হয়।’
শিক্ষকদের বেশি খাতা মূল্যায়নের জন্য দিলে খাতা দেখতে সময় বেশি লাগে জানিয়ে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী অলিখিতভাবে ৩০০ এর বেশি খাতা দিতে মানা করেছেন। আমরা চাইলেও পরীক্ষকদের বেশি খাতা দিতে পারবো না। এছাড়া খাতা নেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনীহা ছিল সেটি কেটে গেছে। পরীক্ষকরা খাতা নিয়েছেন।’
যদিও ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের এমন কথার বিরোধিতা করেছেন শিক্ষকরা। তারা বলছেন, খাতা মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় তাদের দেওয়া হয় না। পারিশ্রমিকও সময় মতো দেওয়া হয় না। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখার সম্মানী এখনো অনেক বোর্ডের শিক্ষকরা পাননি।
কুষ্টিয়ার শিক্ষক এর আর আসাদ বলেন, ‘খাতা মূল্যায়নের সম্মানী এক বছর পর দেওয়া হয়। খাতার পরিমাণও অনেক কম। ৫০০ থেকে ৬০০ খাতা দেওয়া হলে শিক্ষকরা সম্মানী কিছুটা বেশি পেতো। কিন্তু ২০০ থেকে ৩০০ খাতা দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে আমরা হতাশ।’
রুবেল রানা নামে গাজীপুরের আরেক শিক্ষক বলেন, খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের সম্মানী কম দেওয়ার পাশাপাশি দেওয়া হয় অনেক দেরিতে। বোর্ড থেকে খাতা নিয়ে আসা এবং নির্ধারিত সময়ে খাতা জমা দেওয়ার জন্য যে টিএ-ডিএ দেওয়া হয়, সেটিও অপর্যাপ্ত। এছাড়া ছোট ছোট ভুলের জন্য বড় শাস্তির মুখে পড়তে হয়। এজন্য খাতা নিতে প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়। খাতা নিতে গেলে ছুটির প্রয়োজন হয়, যা অনেক সময় প্রতিষ্ঠান দিতে চায় না। এসব ঝামেলার কারণে মূলত শিক্ষকরা খাতা মূল্যায়নে অনীহা দেখাচ্ছেন।’
২৩৫ পরীক্ষকের তালিকা প্রকাশ
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এসএসসির বাংলা প্রথম পত্রের খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া ২৩৫ পরীক্ষক খাতা নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা খাতা সংগ্রহ করেননি। পরে বাধ্য হয়ে গত মঙ্গলবার ২৩৫ পরীক্ষকের তালিকা প্রকাশ করে শিক্ষা বোর্ড। তালিকা প্রকাশের পূর্বে গত ৩০ এপ্রিল মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে খাতা সংগ্রহের কথা জানানো হলেও তারা খাতা সংগ্রহ করেননি।
মঙ্গলবার জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বোর্ড জানায়, এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্য ইটিআইএফভুক্ত শিক্ষকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত তারিখে বোর্ড থেকে উত্তরপত্র গ্রহণ করতে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে মূল্যায়ন কার্যক্রমে বিলম্ব ও জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে, যা পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফল প্রকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষকদের নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে উপস্থিত হয়ে অবশ্যই উত্তরপত্র গ্রহণ করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে উত্তরপত্র গ্রহণে ব্যর্থ হলে তা দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পরীক্ষকদের উত্তরপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনাটি কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।