রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) যন্ত্রকৌশল ও কম্পিউটার প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার এবং ক্যাম্পাসের একটি দোকানের ৭–৮টি চেয়ার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি ঘিরে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের ফয়সাল নাহার ও ফারহান তানভীর তোর্সা এবং সিএসই বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব রেজাকে কেন্দ্র করে গত ৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে ঘটনার সূত্রপাত হয়।
সাকিব রেজার ভাষ্যমতে, ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে তিনি বাসায় ফিরে দেখেন তার রুমমেট ফয়সাল এবং তার বন্ধু ফারহান তার ল্যাপটপ ব্যবহার করছেন। পরে ল্যাপটপ থেকে তিনি দেখতে পান, তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট চালু রয়েছে এবং ব্লুটুথ সংযুক্ত অবস্থায় আছে। এতে তার সন্দেহ হয় যে তার ব্যক্তিগত কথোপকথন তারা দেখেছে।
বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি তার পরিচিত একজনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে তিনি ফয়সাল ও ফারহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ধাক্কা দেন বলে জানান। এরপর তিনি বাসা ছেড়ে ক্যাম্পাসে আসেন। পরে তিনি জানতে পারেন, ফয়সালের আহ্বানে ৮-১০ জন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী তাকে খুঁজতে তাদের ভাড়া বাসায় গিয়েছিল।
পরবর্তীতে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উভয় বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসেন। এতে যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রায় ১৫–১৭ জন এবং সিএসই বিভাগের ১০–১২ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ক্যাম্পাসের ফটিক জলের সামনে সংঘর্ষ শুরু হয়ে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় একটি দোকানের ৭–৮টি চেয়ার ভাঙচুর করা হয়।
সাকিব রেজার দাবি, ক্যাম্পাসের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের এক রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং অন্য এক রাজনৈতিক গ্রুপের সমালোচনা করায় তাকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাকে বাঁশ দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করা হলে তার সহপাঠীরা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে এবং তাদের ওপরও হামলা করা হয়। এতে সিএসই ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাহী আহত হন। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব রেজা বলেন, “আমাকে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে এবং আমি রুয়েট প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই। রাজনৈতিক কারণেই আমার ব্যক্তিগত তথ্য চুরির চেষ্টা করা হয় এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকে আমার ওপর এই হামলা করা হয়েছে।”
তবে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের দাবি ভিন্ন। এ বিষয়ে ফয়সালের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হলেও একই বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব সিদ্দিক জানান, সাকিবের অনুমতি নিয়েই ফয়সাল ও ফারহান তার ল্যাপটপ ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু পরে সাকিব উত্তেজিত হয়ে তার রাজনৈতিক বিষয় কেন দেখা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির অভিযোগ করে ফয়সাল ও ফারহানের ওপর হামলা করেন। হামলায় রেজা ফয়সালের গলা টিপে ধরেন এবং ফারহানকে চড় মারেন। এছাড়াও সাকিব রেজা হত্যার হুমকি দেন বলেও দাবি করেন লাবিব।
লাবিবের ভাষ্যমতে, সাকিব রান্নাঘরের দিকে গেলে আতঙ্কিত হয়ে ফয়সাল ও ফারহান মেকানিকাল ২৪ সিরিজের শিক্ষার্থী শিশিরকে ফোন করে সাহায্য চান। পরে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে আরও ১০–১২ জন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন। পরদিন সকালে ফয়সাল ও ফারহানের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান বলেও দাবি করেন তিনি।
লাবিব আরও বলেন, “আজ সন্ধ্যায় সমঝোতার জন্য বসলে সাকিব ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং মেকানিকালের একজনকে ধাক্কা দেন। এরপরই উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়।এছাড়াও ঘটনার সময় রেজাকে অপ্রকৃতস্থ নেশাগ্রস্থ বলে মনে হয়েছে।”এ ঘটনায় যন্ত্রকৌশল বিভাগের অন্তত ৩–৪ জন শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানান তিনি। আহতদের মধ্যে মুমিন, তাশফিক ও অনয়ের নাম জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মেকানিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই প্রায় ১৫-১৭ জন ঘটনাস্থলে বসে ছিলেন। পরে সিএসই বিভাগের ১০–১২ জন শিক্ষার্থী সেখানে এলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মারামারি শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় সাকিব রেজাকে আঘাত করে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
আহতদের মধ্যে সাকিব রেজা রুয়েট মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নেন এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। অন্য আহত শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার, সহকারী ছাত্রকল্যাণ পরিচালক আবু ইসমাইল সিদ্দিকী এবং নিরাপত্তা শাখার প্রধান আবুল হাশেম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
নিরাপত্তা শাখার প্রধান আবুল হাশেম বলেন, “ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমরা আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি এবং বিষয়টি তদন্তের কাজ শুরু করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে সাকিব রেজা দাবি করেন, ক্যাম্পাসের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং নিজে অন্য এক গ্রুপের কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব সিদ্দিকের দাবি, ঘটনাটি মূলত ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সৃষ্টি হয়েছে এবং এতে সাকিব রেজাই প্রথমে হামলা করেন। ঘটনাটি নিয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।