রমজান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হলেও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি বিশেষ সতর্কতার সময়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও ঘুমের অনিয়ম রক্তে শর্করার মাত্রায় ওঠানামা ঘটাতে পারে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, সচেতন খাদ্য নির্বাচন এবং নিয়ম মেনে চললে ডায়াবেটিক রোগীরাও নিরাপদভাবে রোজা পালন করতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ
ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। রক্তে শর্করার বর্তমান অবস্থা, ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসক রোজা রাখা নিরাপদ কি না তা নির্ধারণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের সময় ও ডোজ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, যা নিজে থেকে না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
সেহরিতে সঠিক খাবার নির্বাচন
সেহরি এমন হওয়া উচিত যা দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাবে এবং হঠাৎ শর্করা বাড়াবে না। আঁশসমৃদ্ধ ও ধীরে হজম হয় এমন খাবার—যেমন লাল চালের ভাত, আটার রুটি, ডাল, সবজি, ডিম বা মাছ—সেহরিতে উপকারী। দই, বাদাম ও ফলও ভালো বিকল্প হতে পারে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা সাদা ময়দার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে পরে হঠাৎ কমিয়ে দিতে পারে।
পানির ঘাটতি যেন না হয়, সেহরিতে পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতারে সংযমই মূলমন্ত্র
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ বেশি খাওয়া রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই খেজুর ও পানি দিয়ে ধীরে ইফতার শুরু করা ভালো। এরপর ফল, সালাদ বা স্যুপ দিয়ে পাকস্থলী প্রস্তুত করে মূল খাবারে যাওয়া উচিত।
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি ও শরবত এড়িয়ে চলা জরুরি। ইফতারের মূল খাবারে পরিমিত ভাত বা রুটি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ও সবজি রাখা উচিত।
রক্তে শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা
অনেকেই মনে করেন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলে রোজা ভেঙে যায়—এ ধারণা ভুল। বরং রোজার সময় শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ঘাম, হাত কাঁপা বা ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত।
কখন রোজা ভেঙে ফেলা জরুরি
যদি রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যায় বা বেড়ে যায়, কিংবা তীব্র দুর্বলতা, অজ্ঞান হওয়ার ভাব, বমি বা ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়—তখন রোজা ভেঙে দেওয়া স্বাস্থ্যগতভাবে প্রয়োজনীয়। ধর্মীয়ভাবেও অসুস্থতার ক্ষেত্রে রোজা ভাঙার অনুমতি রয়েছে।
শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম
রোজার সময় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দিনের বেলায় ভারী কাজ এড়িয়ে চলা ভালো। ইফতারের পর হালকা হাঁটা বা স্বল্প ব্যায়াম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি
ঘুমের অনিয়ম রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাই রমজানে ঘুমের সময়সূচি যতটা সম্ভব ঠিক রাখা জরুরি। মানসিক চাপ কম রাখাও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পানিশূন্যতা রোধে সচেতনতা
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত চা বা কফি পান শরীরের পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে, তাই সীমিত রাখা ভালো।
সচেতনতা ও সংযমই নিরাপদ রোজার চাবিকাঠি
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রোজা মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয়, বরং খাদ্য, ওষুধ, বিশ্রাম ও জীবনযাত্রার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা। চিকিৎসকের পরামর্শ, নিয়মিত শর্করা পরীক্ষা এবং সংযত খাদ্যাভ্যাস—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে রোজা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।