‘ব্রাইডস’ ম্যাগাজিনে মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্কবিষয়ক থেরাপিস্ট মলি বারেটস বলেছেন, রাতে একজনের নাক ডাকার শব্দে অন্যজনের ঘুম ভাঙে। কেউ ঘুমের মধ্যে বারবার পাশ ফেরেন, কেউ আবার আলো জ্বালিয়ে বই পড়তে ভালোবাসেন। কারও ঘুমাতে যাওয়ার সময় রাত ১০টা, কারও মধ্যরাত পেরিয়ে। সকালে ঘুম ভাঙে বিরক্তি আর ক্লান্তি নিয়ে। এর প্রভাব পড়ে সারা দিনের কাজে, মেজাজে, এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কেও।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক দম্পতি বেছে নিচ্ছেন আলাদা ঘরে ঘুমানোর পথ। এই প্রবণতার নাম ‘স্লিপ ডিভোর্স’। নাম শুনে বিচ্ছেদের কথা মনে হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের সম্পর্ক নেই। বরং একসঙ্গে থেকেও দুজনের ভালো ঘুম নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। প্রশ্ন হলো, আলাদা ঘরে ঘুমালে কি সম্পর্ক ভালো থাকে? নাকি এতে বাড়ে দূরত্ব?
কেন আলাদা ঘরে ঘুমাচ্ছেন দম্পতিরা
দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব শুধু শরীরে পড়ে না, মনেও পড়ে। ক্লান্তি থেকে বিরক্তি বাড়ে, কমে যায় ধৈর্য। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতে পারে, সঙ্গীর প্রতি জমতে পারে ক্ষোভ। অথচ সমস্যার মূলে থাকতে পারে নিছক ঘুমের অভাব।
‘ব্রাইডস’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্কবিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আলাদা ঘরে ঘুমানো মানেই দম্পতির মধ্যে ভালোবাসা বা বোঝাপড়ার অভাব নয়। বরং ঘুমের পরিবেশ নিয়ে দুজনের চাহিদা আলাদা হলে এই ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে।
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ও দম্পতি-সম্পর্কবিষয়ক থেরাপিস্ট মলি বারেটসের মতে, সঙ্গীর কাছ থেকে আলাদা ঘরে ঘুমানোর সিদ্ধান্তকে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখার ধারণা পুরোনো। তাঁর মতে, ভালো ঘুম শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বাড়াতে পারে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সম্পর্কেও।
আলাদা ঘরে ঘুমানোর ধারণা অবশ্য নতুন নয়। তবে ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার প্রতি বাড়তি মনোযোগের কারণে এখন বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে।
ভালো ঘুমের সুফল
মনোবিজ্ঞানী নিক হার্ডির মতে, ভালো ঘুম মানুষের ধৈর্য ও কর্মশক্তি বাড়ায়। ফলে সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ ভালো হতে পারে, দৈনন্দিন চাপ সামলানো সহজ হয়। এভাবে ঘুমের উন্নতি পরোক্ষভাবেও সম্পর্কের উপকার করতে পারে।
তবে আলাদা ঘরে ঘুমানোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দিনের শেষে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করা, নিজের কথা ভাগ করে নেওয়া কিংবা সকালে ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ একসঙ্গে কাটানো—এসব অনেক দম্পতির কাছে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলাদা ঘরে ঘুমালে সেই সুযোগ কমে যেতে পারে। কারও মনে হতে পারে, সঙ্গী ইচ্ছা করেই দূরত্ব তৈরি করছেন। আবার ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আলাদা ঘরে ঘুমানো যেন সম্পর্কের বিদ্যমান সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল না হয়। দুজনের মধ্যে আগে থেকেই মনোমালিন্য থাকলে শুধু ঘর আলাদা করে তার সমাধান হবে না। বরং সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা ভাববেন
সম্পর্কবিশেষজ্ঞ মিশেল লেনোর পরামর্শ, বিষয়টি এমনভাবে তুলতে হবে, যাতে সঙ্গী নিজেকে প্রত্যাখ্যাত মনে না করেন। ‘তোমার সঙ্গে ঘুমাতে পারি না’ বলার বদলে বলা যেতে পারে, ‘আমাদের দুজনেরই ভালো ঘুম দরকার। আলাদা ঘরে ঘুমিয়ে দেখলে কেমন হয়?’
কথা বলার সময় দুজনেরই মতামত ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন আলাদা ঘরে ঘুমাতে চাইছেন বলে অন্যজনকে তা মেনে নিতেই হবে, এমন নয়। দুজনের সম্মতিতে কয়েক রাত চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। চাইলে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু রাতও এই ব্যবস্থা অনুসরণ করা যায়।
ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ একসঙ্গে গল্প করা, দিনের কথা ভাগ করে নেওয়া কিংবা সকালে পাশাপাশি বসে চা খাওয়ার মতো ছোট অভ্যাস সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারে। অর্থাৎ ঘুমানোর জায়গা আলাদা হলেও একে অন্যের জন্য সময় রাখা জরুরি।
স্লিপ ডিভোর্সের মূল কথা আলাদা থাকা নয়, বরং দুজনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া। একই বিছানায় ঘুমানোই সুখী দাম্পত্যের একমাত্র চিহ্ন নয়। আবার আলাদা ঘরে ঘুমালেই সম্পর্ক ভালো থাকবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার পাশাপাশি দুজনের স্বাচ্ছন্দ্যও একটি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কখনো কখনো ভালোভাবে ঘুমানোর জন্য নেওয়া ছোট একটি সিদ্ধান্তও সেই সম্পর্ককে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে।
• ‘ব্রাইডস’ ম্যাগাজিন অবলম্বনে