৯৯তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছে বঙ্গ ও ফেসকার্ড প্রযোজিত এবং মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘রইদ’। ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্বাচিত চলচ্চিত্র হিসেবে ‘রইদ’-এর নাম ঘোষণা করা হয়।
এবার অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য মোট পাঁচটি চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল। সেখান থেকে কমিটির মূল্যায়ন ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশের হয়ে ৯৯তম অস্কারের ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম বিভাগে প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ‘রইদ’।
অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘রইদ’-এর আন্তর্জাতিক যাত্রায় যুক্ত হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বঙ্গ প্রযোজিত চলচ্চিত্রটি এর আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত ৪র্থ দা নং এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব (DANAFF)-এ সমালোচক বিভাগে সেরা এশীয় চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে ‘রইদ’।
এছাড়াও ‘রইদ’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে প্রশংসিত হয়েছে। ৫৫তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডাম (IFFR)-এর Tiger Competition-এ নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি সিয়াটল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে সিনেমাটি।
মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’-এর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত এবং আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ। চিত্রনাট্য লিখেছেন সিদ্দিক আহমেদ, মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিন ফারুক আমিন এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে চিত্রায়িত চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত হয়েছে দরিদ্র বর্গাচাষি সাদু এবং তার স্ত্রীকে ঘিরে। নববিবাহিত দম্পতির জীবন, গ্রামীণ সমাজ, রহস্য এবং বাস্তবতা ও মিথের মিথস্ক্রিয়া এক জাদুবাস্তবতার আবহে উঠে এসেছে সিনেমাটিতে।
‘রইদ’ অস্কারে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রযোজক এবং বঙ্গের চিফ কনটেন্ট অফিসার মুশফিকুর রহমান মঞ্জু বলেন, “৯৯তম অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ‘রইদ’ নির্বাচিত হওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি মুহূর্ত। অস্কার বাংলাদেশ কমিটিকে ধন্যবাদ ‘রইদ’কে নির্বাচিত করার জন্য। শুরু থেকেই আমরা মেজবাউর রহমান সুমনের নিজস্ব নির্মাণশৈলী এবং গল্প বলার শক্তিতে আস্থা রেখেছি। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বঙ্গ সাধারণত জনপ্রিয় ঘরানার কনটেন্ট নিয়ে বেশি কাজ করে থাকে। সেই জায়গায় ‘রইদ’ আমাদের পক্ষ থেকে একটি ভিন্ন ধরনের চেষ্টা ছিল। আমরা একটি অভিনব গল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের খাঁটি বাংলা সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম। ‘রইদ’ মুক্তির পর দর্শক, সমালোচকদের কাছ থেকে সিনেমাটি যে ভালোবাসা ও স্বীকৃতি পেয়েছে, তাতে আমাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলে মনে করি। ‘রইদ’ টিমের সকল সদস্য ও কলাকুশলীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন! সাংবাদিক ও রিভিউয়ারদের আন্তরিক ধন্যবাদ ‘রইদ’ নিয়ে লেখালেখি করার জন্য।”
এই প্রসঙ্গে প্রতিভাবান পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, “আমার সিনেমা অস্কারের মতো বড় একটি মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে জেনে খুবই ভালো লাগছে। ‘রইদ’ খুব গভীরভাবে বাংলাদেশের সিনেমা। আমাদের এই অঞ্চলের গল্প, লোককাহিনী, সংস্কৃতি ও এখানকার মানুষের জীবনবোধের ভেতর থেকেই সিনেমাটি উঠে এসেছে। সিনেমাকে আমরা শুধু বাণিজ্যিক বিনোদনের জায়গা থেকে দেখতে চাইনি; এর নান্দনিকতা, ভাবনা এবং নিজেদের গল্প বলার জায়গাটিকেও গুরুত্ব দিতে চেয়েছি। এই যাত্রার সঙ্গী হওয়ায় বঙ্গ-এর প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। একটি মেইনস্ট্রিম ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হয়েও বঙ্গ ‘রইদ’-এর মতো ভিন্নধর্মী ও নান্দনিক একটি চলচ্চিত্রের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সিনেমাটিকে বড় পরিসরে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একসময় বাংলাদেশের সিনেমার জন্য অস্কারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানো অনেক কঠিন ছিল। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বেশ কিছু ভালো মানের চলচ্চিত্র এই জায়গায় প্রতিনিধিত্ব করেছে, যা আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য আশাব্যঞ্জক। ‘রইদ’ বাংলাদেশের হয়ে সেই যাত্রার অংশ হতে পেরেছে- এটাই আমাদের জন্য বড় পাওয়া। আশা করি, সামনে বাংলাদেশের আরও অনেক গল্প আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছুবে।”
‘রইদ’-এর এই পথচলা বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দা নং এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা এশীয় চলচ্চিত্রের সমালোচক পুরস্কার অর্জনের পর এবার ৯৯তম অস্কারের আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে চলচ্চিত্রটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগকে বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছে ‘রইদ’-এর পুরো টিম। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেওয়ার এই পথচলায় বঙ্গ ভবিষ্যতে জনপ্রিয় ঘরানার কনটেন্টের পাশাপাশি মৌলিক গল্প ও আর্টনির্ভর চলচ্চিত্রের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।