মাঝরাতে হঠাৎই ঘুম ভাঙার পর অনুভব করলেন, আপনার বুকের ওপর ভারী কিছু বসে আছে। খুব করে চেষ্টার পরও ঠিকঠাক নিশ্বাস নিতে পারছেন না। আপনি জেগে আছেন কিন্তু শরীরের কোনো অংশ নাড়াতে পারছেন না। এমনকি চিৎকারও করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস বলে থাকেন।
বোবায় ধরা আসলে কী?
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠার পর শরীর নাড়াতে না পারা, কথা বলতে না পারা বা চিৎকার করতে না পারার অভিজ্ঞতাকে সাধারণভাবে ‘বোবায় ধরা’ বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে স্লিপ প্যারালাইসিস (Sleep Paralysis) বলা হয়।
এ সময় একজন ব্যক্তি সচেতন থাকলেও কিছুক্ষণের জন্য শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। অনেকের মনে হয় বুকের ওপর ভারী কিছু চাপ দিয়ে আছে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট পর্যন্ত এই অবস্থা স্থায়ী হয়। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে সময়টি অনেক দীর্ঘ মনে হতে পারে।
কেন হয়?
স্লিপ প্যারালাইসিস মূলত ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে। ঘুমের REM (Rapid Eye Movement) পর্যায়ে মস্তিষ্ক বেশ সক্রিয় থাকে এবং এ সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু শরীরের অধিকাংশ পেশি তখন সাময়িকভাবে শিথিল বা নিষ্ক্রিয় থাকে।
কখনো মস্তিষ্ক ঘুম থেকে জেগে উঠলেও শরীরের এই শিথিল অবস্থা কিছু সময় থেকে যায়। তখন ব্যক্তি চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকেন, কিন্তু শরীর নড়াতে বা কথা বলতে পারেন না। এটিই স্লিপ প্যারালাইসিসের প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, REM ঘুমের সময় মস্তিষ্ক থেকে গ্লাইসিন ও গামা অ্যামাইনোবিউটিরিক অ্যাসিড (GABA) নামের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এগুলো মাংসপেশির কার্যক্রম সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়।
কারা বেশি আক্রান্ত হন?
স্লিপ প্যারালাইসিস যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এটি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কিছু বিষয় এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন—
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা ঘুমের মধ্যে বারবার ব্যাঘাত হওয়া
অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
মাদক গ্রহণ, ধূমপান বা মদ্যপান
পরিবারে কারও স্লিপ প্যারালাইসিসের ইতিহাস থাকা
কিছু মানসিক সমস্যা, যেমন প্যানিক ডিসঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার
বোবায় ধরার লক্ষণ কী?
স্লিপ প্যারালাইসিসের সময় সাধারণত কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়। যেমন—
শরীর নড়াতে বা কথা বলতে না পারা
বুকের ওপর চাপ অনুভব করা
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হওয়া
চোখ খুলতে বা চোখ নড়াতে সমস্যা হওয়া
আশপাশে কোনো ব্যক্তি বা অস্বাভাবিক কিছু উপস্থিত আছে বলে মনে হওয়া
প্রচণ্ড ভয় পাওয়া বা ঘাম হওয়া
হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া
সাধারণত কিছুক্ষণ পর এই অবস্থা নিজে থেকেই কেটে যায় এবং তখন আবার স্বাভাবিকভাবে কথা বলা ও নড়াচড়া করা সম্ভব হয়।
কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়?
স্লিপ প্যারালাইসিস সাধারণত গুরুতর কোনো রোগ নয়। ঘুমের অভ্যাস ঠিক করা এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে এর প্রবণতা কমানো যায়।
এ জন্য—
১. প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে।
২. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে।
৩. শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখতে হবে।
৪. ঘুমানোর আগে ভারী খাবার, চা-কফি, ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে।
৫. ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ব্যায়াম শেষ করা ভালো।
৬. ঘুমানোর সময় মোবাইল, ল্যাপটপসহ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এমন জিনিস দূরে রাখতে হবে।
৭. দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলতে হবে।
৮. স্লিপ প্যারালাইসিস শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে মনে রাখতে হবে—এটি সাময়িক এবং কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
মাঝেমধ্যে স্লিপ প্যারালাইসিস হলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে এটি যদি বারবার ঘটে এবং ঘুমে নিয়মিত ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা বা বারবার স্লিপ প্যারালাইসিস হলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাম (EMG) বা দিনের বেলার ঘুম পরীক্ষা, যেমন Multiple Sleep Latency Test (MSLT) করা হতে পারে।