মাত্র ২৫ বছরের জীবনে ঢাকাই চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালে তার মৃত্যুর পর কেটে গেছে ২৯ বছর। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে রহস্য আর বিতর্কের অবসান হয়নি। দীর্ঘ এই সময়ের পর সম্প্রতি মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে (৫৪) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরপর সালমান শাহের পরিবার আশা করছে, এবার হয়তো তার মৃত্যুর রহস্যের জট খুলবে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার বাকি আসামিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদের মধ্যে সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হকও রয়েছেন।
ডনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আরিফুর রহমান আদালতকে বলেন, মামলার বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল। মামলার তদন্ত এখনো চলছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে জানান, সালমান শাহের ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ১৯৯৭ সালে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা হয়।
তিনি আরও বলেন, মামলার আসামি রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদের জবানবন্দিতে ডনের সঙ্গে সামিরা হকের অনৈতিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। ওই জবানবন্দি অনুযায়ী, ডন, ফারুক ও রেজভী ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের প্রথমে সালমান শাহকে অচেতন করার এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে তাকে ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও সংস্থাটির প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, “একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি নিয়ে কাজ করছেন।”
পরিবারের বক্তব্য
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের নিজ বাসা থেকে সালমান শাহ’র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার জন্মনাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্ম তার। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন সালমান শাহ।
তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছে তার পরিবার।
সালমান শাহের মামা আলমগীর কুমকুম মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে বলেন, ২৯ বছর পর মামলার একজন আসামি গ্রেফতার হওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে তার দাবি, সালমান শাহের বাসার গৃহকর্মী আবুল, মনোয়ারা ও ডলিও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং মৃত্যুর দিন তারা বাসায় উপস্থিত ছিলেন। তাদের পুলিশ কখনো জিজ্ঞাসাবাদ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আলমগীর কুমকুম বলেন, আমি আবুলকে খুঁজতে তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ করে বাড়ি বানিয়েছে। এত টাকা সে কোথায় পেল? আমার বিশ্বাস, হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই তাকে এই টাকা দিয়েছে।
অন্য আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি বলেন, সামিরা হকসহ অন্য আসামিদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। পুলিশ আমাদের কাছ থেকে সামিরার ফোন নম্বর নিয়েছে। তারা বলছে, আমরা যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রেফতারে সহযোগিতা করি। এটা আমার দায়িত্ব নয়।
তিনি আরও বলেন, সামিরাকে গ্রেফতার করা পুলিশের দায়িত্ব। আমার নয়। হয়তো তারা ইচ্ছা করেই তাকে গ্রেফতার করছে না।
তাদের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, সামিরাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ যে সহযোগিতা চেয়েছে, তারা তা করেছেন। এরপরও কেন তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, সেটা পুলিশই ভালো বলতে পারবে।
শুরু থেকেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিতর্ক
ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে শুরু থেকেই পরিবারের দাবি ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ, পরিবার হত্যা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ সেটি অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নেয়।
এরপর প্রায় তিন দশকে একাধিক তদন্তে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ছেলে হত্যার অভিযোগ থেকে সরে আসেননি নীলা চৌধুরী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
এর ধারাবাহিকতায় আদালতের নির্দেশে গত বছরের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর আসামিরা যাতে দেশ ছাড়তে না পারেন, সে জন্য রমনা থানা থেকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।
সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার মামা আলমগীর কুমকুম এই মামলা করেন। সামিরা হক ও ডন ছাড়াও মামলার অন্য আসামিরা হলেন—সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, এ. সাত্তার, সাজু এবং রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদ।
আগের তদন্তগুলোতে কী বলা হয়েছিল
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।
এর বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন তার বাবা। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহের মৃত্যুকে ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ বলা হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল নীলা চৌধুরী আবারও মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সালমান শাহের অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তার আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরে ২০২১ সালের অক্টোবরে ওই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেন নীলা চৌধুরী। আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, সালমান শাহের অপমৃত্যুর ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত না করেই এবং আসামিদের প্রভাবে প্রতিবেদনটি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
আবেদনের শুনানি শেষে গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে রমনা থানাকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই মামলাতেই আসামি ডন গ্রেফতার হয়েছেন।