Image description

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গত কয়েক সপ্তাহে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনকে ঘিরে যে সংঘাতের ছবি সামনে এসেছে, তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়নি, প্রশ্ন তুলেছে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি, আর তার মাঝেই পুলিশের ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং ব্যাপক আটক। জন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থল থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবিগুলো এখন নাড়া দিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেককে। এই আবহেই দেশের সাংস্কৃতিক জগতের বহু মানুষ নীরব না থেকে রাস্তায় নামা তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে বলিউডের একাধিক শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি জানিয়েছেন সংহতি।

কেউ সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন, কেউ নিজেদের অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন, কেউ আবার পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন সরাসরি। অন্যদিকে, ইন্ডাস্ট্রির বহু বড় মুখ এখনও পর্যন্ত নীরব। আর সেই নীরবতাও এখন জনপরিসরে আলোচনার বিষয়।

ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং-এর বার্তা। খুব সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগঘন সেই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আমাদের দেশের তরুণরা অমর। ঈশ্বর তাদের শক্তি দিন।” আন্দোলনরত হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কাছে এই বার্তা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সমর্থন। কারণ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের একজন যখন যুবসমাজের পাশে দাঁড়ান, তখন সেই বার্তার প্রভাবও বহু গুণ বেড়ে যায়।

অরিজিতের পরেই সামনে আসে হানি সিং-এর অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বিনোদন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিত এই র‌্যাপার ও সংগীতশিল্পী শুধু সমর্থনের বার্তাই দেননি, নিজের নতুন গান ‘মুনলাইটের’ টিজার প্রকাশও স্থগিত করেন। তার বক্তব্য ছিল, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোই বেশি জরুরি।

একই পথে হাঁটেন জনপ্রিয় গায়ক আরমান মালিক। ২২ জুলাই তার নতুন গান প্রকাশ পাওয়ার কথা ছিল। ঘটনাচক্রে সেই দিনই ছিল তার জন্মদিন। কিন্তু আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে গান প্রকাশ করবেন না তিনি। ভিডিও বার্তায় আরমান জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎসবের আবহ তৈরি করার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি নেই। তাই গান প্রকাশ আপাতত পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিল্পীর এই অবস্থানও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।

তবে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর কেবল সংগীতজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বলিউডের প্রবীণ এবং সমকালীন শিল্পীদের একটি বড় অংশও প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন। শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ, দিয়া মির্জা, হুমা কুরেশি, বির দাস, সোনু সুদ, সোহা আলি খান, অদিতি রাও হায়দরি, রীতেশ দেশমুখ, জেনেলিয়া দেশমুখ, আলি ফজল, ফাতিমা সানা শেখ, নাফিসা আলি, সোনি রাজদান, স্বানন্দ কিরকিরেসহ একাধিক শিল্পী ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাব কি লাঠিচার্জ হতে পারে?

জন্তর মন্তরে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংহতি প্রকাশ করেন প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা-পরিচালক প্রকাশ রাজ, কৌতুকশিল্পী কুনাল কামরা এবং অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার পক্ষে সওয়াল করেন তারা। শাবানা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন, অনশনরতদের পাশে বসেন। প্রকাশ রাজও মঞ্চে উঠে বলেছেন, “আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি।”

এই তালিকায় আরও উল্লেখযোগ্য নাম দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ হওয়া উচিত ছিল না। এমন মন্তব্যের জন্য তাচকে আবারও ‘দেশবিরোধী’ বলা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবু নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তার বক্তব্য, মতপ্রকাশের অধিকার কোনো সরকারের দয়া নয়, তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।

ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের নজির নতুন নয়। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও শিল্পীদের একাংশ প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক মাধ্যমের আক্রমণাত্মক পরিবেশের কারণে বহু শিল্পী প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করা থেকে দূরে সরে গিয়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা মুখ খুলেছেন, আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাদের অবস্থান।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বলিউডের বহু প্রথম সারির তারকাকে ঘিরে। যাদের কোটি কোটি অনুরাগী, যাদের একটি পোস্ট মুহূর্তে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তাদের বড় অংশ এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সমাজের সংকটময় মুহূর্তে এই নীরবতা কি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ? যদিও অন্য একটি অংশের মত, শিল্পীদের উপর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।