বয়স বাড়ছে, পরিবার চাপ দিচ্ছে, বন্ধুরা একে একে সংসারী হয়ে যাচ্ছেন—তারপরও অনেক মানুষ বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই অস্বস্তিতে ভোগেন। কেউ বিষয়টি এড়িয়ে যান, কেউ সরাসরি বলে দেন—‘আমি বিয়ের জন্য না।’ সমাজে এটিকে প্রায়ই দায়িত্ব এড়ানো বা কমিটমেন্ট সমস্যার চোখে দেখা হয়। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সবসময় বিষয়টি এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে কাজ করে গভীর মানসিক ভয়, যার নাম ‘গ্যামোফোবিয়া’।
মনোবিজ্ঞানে বিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগকে বলা হয় ‘গ্যামোফোবিয়া’ । এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে বৈবাহিক বন্ধন বা স্থায়ী সম্পর্কে জড়ানোর চিন্তাই কারও মধ্যে তীব্র চাপ, অস্বস্তি বা আতঙ্ক তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয় হঠাৎ তৈরি হয় না। এর শিকড় অনেক সময় শৈশবেই গড়ে ওঠে। যারা ছোটবেলায় বাবা-মায়ের তীব্র ঝগড়া, সহিংসতা, বিচ্ছেদ কিংবা বিষাক্ত সম্পর্ক দেখেছেন, তাদের অনেকের মনেই অবচেতনভাবে ধারণা জন্মায়—বিয়ে মানেই অশান্তি, কষ্ট বা স্বাধীনতা হারানো। ফলে বড় হওয়ার পর সম্পর্কের গভীরে যেতে তারা ভয় পান।
সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতের প্রতারণা, তিক্ত ব্রেকআপ বা মানসিক আঘাতও মানুষকে বিয়ে থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় বা ‘অ্যাটাচমেন্ট অ্যানজাইটি’ বেশি, তারা সম্পর্কে নিরাপত্তাবোধ করতে পারেন না। ফলে স্থায়ী সম্পর্কের চিন্তাই তাদের কাছে চাপের হয়ে ওঠে।
আধুনিক জীবনযাপনও এই প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ক্যারিয়ার, আর্থিক স্থিতি ও ব্যক্তিগত সময়কে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের কাছে বিয়ে অনেক সময় দায়বদ্ধতা, সমঝোতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে ধরা পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এতে বড় ভূমিকা রাখছে। সম্পর্ক ভাঙার গল্প, বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা কিংবা ‘টক্সিক ম্যারেজ’ নিয়ে অসংখ্য কনটেন্ট মানুষের মনে বিয়ে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কনটেন্ট দীর্ঘমেয়াদে মানুষের অবচেতন মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই মনে করেন, তারা এখনও বিয়ের জন্য প্রস্তুত নন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বড় সামাজিক ও আর্থিক দায়িত্বও।
তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিয়ে নিয়ে ভয় থাকা মানেই কেউ অস্বাভাবিক নন। কিন্তু সেই ভয় যদি ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক বা মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। খোলামেলা আলোচনা, আত্মবিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং অনেক ক্ষেত্রেই এই ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।