মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি লিভার। প্রতিদিন এটি শরীরের রক্ত থেকে টক্সিন, রাসায়নিক পদার্থ ও বর্জ্য ফিল্টার করে। সেই সঙ্গে হজমে সহায়তা, শক্তি সঞ্চয়, রক্ত পরিশোধন থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল রাখার মতো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গটি।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, ও অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে বর্তমানে লিভারজনিত রোগ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ মানুষ মারা যায় লিভার ক্যান্সারে। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ রোগই সম্পর্কিত থাকে অস্বাস্থ্যকর রান্নার অভ্যাস ও পুনরায় গরম করা খাবারের সঙ্গে।
অনেকেই মনে করেন ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার গরম করে খেলেই হবে, এতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু কিছু খাবার একবার রান্না হওয়ার পর আবার গরম করলে তাতে তৈরি হয় এমন কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক, যা ধীরে ধীরে লিভার কোষ ধ্বংস করতে শুরু করে। এ ক্ষতি একদিনে নয়, ধীরে ধীরে মাসের পর মাস ধরে জমে গিয়ে এক সময় লিভার ক্যান্সারের রূপ নেয়।
খাবার গরম করার সময় যখন তার ভেতরের প্রোটিন, চর্বি ও কার্বোহাইড্রেট ভেঙে যায়, তখন তৈরি হয় অ্যালডিহাইড, অ্যাক্রিলামাইড, নাইট্রোসামিন নামের বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ। এগুলো রক্তে মিশে সরাসরি লিভারে পৌঁছে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে। ফলে লিভার কোষ ক্ষয় হতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।
১. বারবার গরম করা তেল ও ভাজাপোড়া খাবার
তেল দিয়ে একবার কোনো খাবার রান্না করার পর আবারও ওই তেল গরম করা হলে ট্রান্স ফ্যাট ও পলিমারাইজড কম্পাউন্ড তৈরি হয়। এসব উপাদান লিভারে চর্বি জমিয়ে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়, যা পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পুনরায় গরম করা তেলে থাকা অ্যালডিহাইড লিভার কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
২. গরম করা ভাত
রান্না করা ভাত ঠান্ডা হওয়ার পর আবার গরম করলে এতে ব্যাসিলাস সেরিয়াস নামের তাপ-সহনশীল ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া থেকে উৎপন্ন টক্সিন লিভারের জন্য ক্ষতিকর এবং গুরুতর ক্ষেত্রে ‘একিউট লিভার টক্সিসিটি’ পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
৩. আলু
রান্না করা বা ভাজা আলু পুনরায় গরম করলে অ্যাক্রিলামাইড নামের ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) এটিকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি লিভারসহ শরীরের বিভিন্ন কোষের ক্ষতি করতে পারে।
৪. মুরগি, ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
মুরগি বা ডিম বারবার গরম করলে প্রোটিনের গঠন ভেঙে গিয়ে হেটেরোসাইক্লিক অ্যামিন (এইচসিএ) তৈরি হতে পারে। এ যৌগ লিভার ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া পুনরায় গরম করা ডিম হজমে সমস্যা তৈরি করে এবং লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে।
৫. শাকসবজি ও দুধজাত খাবার
পালং শাক, বিট, গাজর বা বাঁধাকপির মতো সবজি পুনরায় গরম করলে নাইট্রেট থেকে নাইট্রাইট এবং পরে নাইট্রোসামিন তৈরি হতে পারে, যা ক্যান্সারজনিত রাসায়নিক হিসেবে পরিচিত। একইভাবে দুধ, পায়েস, খির বা কাস্টার্ড বারবার গরম করলে অক্সিডাইজড ফ্যাটি অ্যাসিড ও ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়, যা লিভারে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।