লিভার–সংক্রান্ত জটিলতায় লাইফ সাপোর্টে থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার রাত ১১টায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয়েছে।
কারিনা কায়সার বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন এবং আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন।
দ্য ডিসেন্ট এর আগে এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, কারিনার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আওয়ামীপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা তার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালিয়েছেন। এমনকি শত শত পোস্টের মাধ্যমে তার মৃত্যু কামনাও করা হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য কারিনা কায়সারকে ভারতে নেওয়ার পর থেকেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং পলাতক আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে তাকে ঘিরে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়েছে।
এসব পোস্টে কারিনাকে ‘ভারতবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট’, ‘পাকিস্তানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার’, ‘পাকিস্তানের চর’, ‘আইএসআইয়ের সদস্য’ এবং ‘আমেরিকার ডিপ স্টেটের অংশ’—ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তার ভিসা বাতিল এবং তাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে।
ভারত থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ অ্যাকাউন্টগুলো ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি কে সমর্থন করেন।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থী এক্টিভিষ্ট সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী এক এক্স পোস্টে দাবি করেন, “পাকিস্তানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার ভারতে যাচ্ছেন! ভারতবিদ্বেষী ইনফ্লুয়েন্সার কারিনা কায়সার ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভারতীয় ভিসা পেয়েছেন। তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতে নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ও পাকিস্তানি আইএসআইয়ের কথিত পরিকল্পনায় কারিনা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের পর কারিনা ও তার পরিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে অংশ নেয়। এরপর থেকে তিনি ভারত, এমনকি হিন্দুদের বিরুদ্ধেও কুখ্যাত প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।”

তার পোস্টটি সাড়ে তিন লাখের বেশি দেখা হয় এবং প্রায় ৪ হাজার ব্যবহারকারী সেটি রিপোস্ট করেন।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর পোস্টের পরপরই ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে এক্সে কারিনাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
ভারতের বিজেপিপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার Saravanaprasad Balasubramanian এক এক্স পোস্টে লেখেন, “ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী মন্তব্যের জন্য পরিচিত বাংলাদেশভিত্তিক ইনফ্লুয়েন্সার কারিনা কায়সার ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে মেডিকেল ভিসা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তিনি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতে যাবেন। এর আগে কারিনার বিরুদ্ধে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা রাজনৈতিক আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। অনলাইনে ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী প্রচারণা ছড়ানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।”

ভারতভিত্তিক Proud Hindu Sunil (@SSVerma22439706) অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি শেয়ার করে দাবি করা হয়, “কারিনা কায়সারকে ভারতভূমিতে ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়।”
একই দাবি করেছেন ভারতভিত্তিক আরেক এক্স ব্যবহারকারী Aloke Josh (@alokejoshi)।
Akhil নামে আরেক ভারতীয় ব্যবহারকারী লেখেন, “যাদের সম্পূর্ণ ভারতবিরোধী এজেন্ডা আছে, তাদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কতটা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি! এখানে দেখুন কারিনা কায়সারকে। এমন বিষাক্ত একজন মানুষকে কীভাবে ভিসা দেওয়া যায়? এমন ভুলের জন্য আমরা আপনাদের ভোট দিইনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এর জন্য কারও না কারও জবাবদিহি করা উচিত। আপনারা নির্লজ্জ।”
Independent Woke নামে ভারতভিত্তিক আরেক ব্যবহারকারী লেখেন, “কারিনা কায়সার নামে একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ও আইএসআইয়ের সম্পর্ক রয়েছে এবং যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছেন, তিনি কীভাবে চেন্নাইয়ে চিকিৎসার জন্য ভিসা পেলেন? আমাদের ব্যবস্থা কি আপসের শিকার? জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
Voice Of BD Hindus নামে একটি সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্ট এক পোস্টে লিখেছে, “ব্রেকিং: ভারতবিরোধী ইনফ্লুয়েন্সার কারিনা কায়সার, যিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, পতনের পর তার বাসভবন লুট করেছেন এবং ভারতবিরোধী কনটেন্ট ও স্লোগানের ওপর নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন, তিনি এখন চিকিৎসার জন্য ভারতে যাচ্ছেন—ভারতীয় ভিসায়। বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত।”

Anura নামে একজন ভারতীয় ব্যবহারকারী লেখেন, “ভারতবিদ্বেষী পাকিস্তানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার কারিনা কায়সার চেন্নাইয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতীয় ভিসা পেয়েছেন। তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সেখানে নেওয়া হচ্ছে। এই একই ব্যক্তি ২০২৪ সালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ও পাকিস্তানি আইএসআইয়ের কথিত পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। পতনের পর তিনি ও তার পরিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেন। এরপর মাসের পর মাস ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী বিষাক্ত প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছেন।”
বিজেপিপন্থী আরেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার KV Iyyer – BHARAT এক এক্স পোস্টে লেখেন, “ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী মন্তব্যের জন্য পরিচিত বাংলাদেশভিত্তিক ইনফ্লুয়েন্সার কারিনা কায়সার ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে মেডিকেল ভিসা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তিনি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতে যাবেন। এর আগে কারিনার বিরুদ্ধে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা রাজনৈতিক আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। অনলাইনে ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী প্রচারণা ছড়ানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।”
দ্য ডিসেন্ট এমন অন্তত কয়েক ডজন পোস্ট শনাক্ত করেছে, যেখানে কারিনাকে পাকিস্তানপন্থী দাবি করে তার ভিসা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে এবং তাকে ভারতে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার সমালোচনা করা হয়েছে।
দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।
বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভারতে গিয়ে অনলাইন হয়রানি বা টার্গেটেড প্রচারণার মুখে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব মাহদী হাসান ব্যক্তিগত কাজে দিল্লিতে অবস্থানকালে তার অজ্ঞাতে ভিডিও ধারণ করে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এসব পোস্টের কারণে তাকে হুমকি ও হেনস্তার মুখে পড়তে হয়। এমনকি বাংলাদেশে ফেরার পথে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ মাহদী হাসানকে বিমানবন্দরে আটকে দেয়।