ঠাকুরগাঁও জেলার মাঠজুড়ে এখন দোল খাচ্ছে সাদা ফুল। দূর থেকে দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো। তবে এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে কৃষকদের কাছে ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত পেঁয়াজের বীজ। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এ বছর জেলায় পেঁয়াজ বীজের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে প্রায় ২২২ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে ফুটে আছে পেঁয়াজের সাদা ফুল। ফুল শুকিয়ে গেলে সেখান থেকেই বের হয় কালো রঙের ছোট বীজ। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক এখন হাতের স্পর্শে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ণ করছেন। কৃষকদের দাবি, এতে ফলনও ভালো হচ্ছে। পেঁয়াজ বীজের আবাদ বাড়ায় এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় ৫৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৫ হেক্টরে। উৎপাদিত এসব বীজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
জেলার সদর উপজেলার মথরাপুর গ্রামের কৃষক মো. কামাল বলেন, গত বছর চার একর জমিতে পেঁয়াজ বীজ চাষ করে দ্বিগুণ লাভ হয়েছিল। তাই এবার তিনি নয় একর জমিতে বীজ চাষ করেছেন। তার ক্ষেতে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে এবার প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, এবারই প্রথম তিন একর জমিতে পেঁয়াজ বীজ চাষ করছেন তিনি। আগের বছর অন্য কৃষকদের লাভবান হতে দেখে এ চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক জিতেন চন্দ্র বলেন, পেঁয়াজ বীজ চাষে খরচ তুলনামূলক বেশি। নিয়মিত সেচ দিতে হয়, শ্রমিকও লাগে। তবে দাম ভালো থাকলে কৃষক লাভবান হন।
পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন স্থানীয় অনেক নারী-পুরুষ শ্রমিক। কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউ কীটনাশক ছিটাচ্ছেন, আবার কেউ হাত দিয়ে পরাগায়ণের কাজ করছেন। শ্রমিক জয়া রাণী বলেন, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন কাজ করেন ক্ষেতে। পুরুষ শ্রমিকরা বেশি মজুরি পান, নারীরা পান কম। তবে এ কাজের মাধ্যমে সংসার চালাতে পারছেন।

আরেক নারী শ্রমিক গীতা রাণী বলেন, এই সময়ে অন্য কাজ তেমন থাকে না। পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতে কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ টাকা আয় করছেন তিনি। এতে সংসারের খরচ ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) আলমগীর কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাজারে পেঁয়াজের কালো বীজ উচ্চ দামে বিক্রি হওয়ায় এ জেলার কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ বীজ চাষের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নানা ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ আশা করছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে প্রায় ২২২ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ বিক্রি হতে পারে। এ জন্য কৃষকদের প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।