Image description

বছরের পর বছর একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছিল—সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে খেজুর আসবে, তা বিমানবন্দর থেকে রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে যাবে, আর পবিত্র রমজানে সাধারণ মানুষ সেই সরকারি খেজুরের বদলে বাজারে চড়া দামে ‘মরিয়ম’ বা ‘আজওয়া’ খুঁজবে। কিন্তু এবার দৃশ্যপট বদলে দিয়েছেন তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি যেভাবে কার্টন খুলে খেজুরের সংখ্যা আর বিতরণের তালিকা প্রকাশ করেছেন, তাতে দীর্ঘদিনের ‘খেজুর-খেকো’ সিন্ডিকেটের পিলে চমকে গেছে।

 

এর আগে রমজান মাসের শুরুতেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন সৌদি আরবের কার্গো বিমান এসে নামল, চারপাশের আবহাওয়া ছিল বেশ থমথমে। গত কয়েক দশক ধরে এই কার্গোর পেটে আসা লাখ লাখ টন খেজুর কোথায়, কার ফ্রিজে, বা কোন নেতার গোডাউনে যেত—তার কোনো হিসাব ছিল না। কিন্তু এবার বাংলাদেশ চলছে নতুন নিয়মে। এবার দায়িত্বে আছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

 

বিমানবন্দরে খেজুর নামার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই হাসনাতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি লাইভ শুরু হলো। ক্যাপশন: ‘সৌদি খেজুরের পাই টু পাই হিসাব: ট্রান্সপারেন্সি ইজ আওয়ার ফার্স্ট প্রায়োরিটি!’ সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুগল ড্রাইভের লিংক।

 

লিংকে ক্লিক করতেই জাতির চক্ষু চড়কগাছ! সেখানে ২৫ মেগাবাইটের এক বিশাল এক্সেল শিট। মোট খেজুরের সংখ্যা: ১০ কোটি ১২ লাখ ৫ হাজার ৪টি। এর মধ্যে আজওয়া কতটি, মরিয়ম কতটি, এমনকি কয়টি খেজুরের ভেতরে ইঁদুরের কামড়ের দাগ পাওয়া গেছে—তার নিখুঁত পাই-চার্ট দেওয়া। হাসনাতের সেই লাইভ শুধু বাংলাদেশিরা দেখেছে তা নয়, লাইভটি নজরে এসেছে সৌদি আরবের গোয়েন্দাদের। তারা বিষয়টি সৌদি যুবরাজকে অবহিত করেছেন।

 
 

 

এই এক্সেল শিট আপলোড হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় হাসনাতের হোয়াটসঅ্যাপ বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে— ‘লোকেশন: রিয়াদ, সৌদি আরব।’

 

হাসনাত ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই কল রিসিভ করলেন।

 

হাসনাত: হ্যালো! একাউন্টেবিলিটি এনশিওর করাই আমাদের লক্ষ্য। কে বলছেন?

 

- ওপাশ থেকে ভারী, কিন্তু বেশ বিস্মিত গলায় আওয়াজ এলো, হ্যালো ব্রাদার হাসনাত। আমি এমবিএস (মোহাম্মদ বিন সালমান) বলছি। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স।

 

- হাসনাত একটু নড়েচড়ে বসলেন। গলাটা পরিষ্কার করে বললেন, ওহ! মহামান্য যুবরাজ, আসসালামু আলাইকুম! আপনার পাঠানো খেজুরের হিসাব আমি ইতোমধ্যে ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছি। আপনি চাইলে আপনাকে এডিটর এক্সেস দিতে পারি, যদিও ভিউয়ার এক্সেস পাবলিক করা আছে।
এমবিএস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ফোনালাপের মাধ্যমেও সেই দীর্ঘশ্বাসের ওজন টের পাওয়া গেল।

 

যুবরাজ এমবিএস: ইয়া শেখ হাসনাত! আপনার লাইভ দেখে আমার রাজকীয় গোয়েন্দারা তো ডিপ্রেশনে চলে গেছে! আমি তো ভেবেছিলাম আমার গোয়েন্দারা আমাকে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে। তারা বলল, বাংলাদেশে একজন এমপি নাকি লাইভে এসে খেজুর গুনছেন! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারিনি। আমাদের হিসেবে তো গত বিশ বছরে বাংলাদেশে আমরা যত খেজুর পাঠিয়েছি, তার অর্ধেকও সাধারণ মানুষের মুখে পড়ার কথা নয়। সেগুলো তো কোনো না কোনো নেতার পকেটে বা গুদামে গিয়ে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ইতিহাস আছে। আপনি এই অসাধ্য সাধন করলেন কীভাবে?

 

হাসনাত আব্দুল্লাহ: (বিনয়ের সঙ্গে হেসে) যুবরাজ, আসলে অসাধ্য কিছু নয়। আমরা শুধু পুরোনো একটা জং ধরা তালা ভেঙে ফেলেছি। আগে সিস্টেমটা ছিল এমন—খেজুর আসত ‘উপহার’ হিসেবে, আর নেতারা সেটা মনে করতেন ‘বাপদাদার সম্পত্তি’। আমি শুধু মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছি যে, এটা তাদের হক। আর যখন লাখ লাখ মানুষ স্ক্রিনের ওপারে তাকিয়ে থাকে, তখন চাইলেও কেউ একটা খেজুর পকেটে ভরার সাহস পায় না। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে আমরা এখন ‘সততার বাংলাদেশে’ যাওয়ার চেষ্টা করছি তো!

 

যুবরাজ এমবিএস: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) শুনুন হাসনাত, আগে যখন আপনাদের দেশের বড় বড় হোমরাচোমরারা রিয়াদে আসতেন, তারা বলতেন—‘যুবরাজ, আপনাদের পাঠানো খেজুর তো পচে গেছে’ কিংবা ‘জাহাজে পানি ঢুকে সব নষ্ট হয়ে গেছে।’ আমরা ভাবতাম বাংলাদেশের আবহাওয়া বোধহয় খেজুরের জন্য বড্ড শত্রু। কিন্তু এখন দেখছি আবহাওয়া ঠিকই ছিল, সমস্যা ছিল আপনাদের সিস্টেমের ‘ইঁদুর’গুলোর মধ্যে। তারা খেজুরের দানা নয়, পুরো কার্টন চিবিয়ে খেয়ে ফেলত!

 

হাসনাত আব্দুল্লাহ: জি যুবরাজ, ঠিকই ধরেছেন। আগে সংসদ সদস্যরা মনে করতেন, রমজানে খেজুর বিতরণ করা মানে দয়া দেখানো। তারা নিজের নামে প্যাকেট করে বিলি করতেন। অথচ সেটা ছিল আপনাদের পাঠানো জনগণের আমানত। আমি সেই আমানতটা শুধু তার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আর হ্যাঁ, এবার কিন্তু ইঁদুরগুলো আর সুযোগ পায়নি, কারণ লাইভ ক্যামেরা ছিল ইঁদুর মারার বিষের মতো শক্তিশালী!

 

যুবরাজ এমবিএস: আমি একটা চরম কনফিউশনে পড়ে গেছি। আমরা তো ভাই খেজুর পাঠাই টন হিসেবে, বিশাল বিশাল কার্গো বিমানে করে। ট্রাকেও মাপা হয় স্কেলে। তুমি এগুলো পিস হিসেবে গুনলে কীভাবে? তোমাদের কি স্পেশাল কোনো ‘অটোমেটেড খেজুর কাউন্টিং মেশিন’ আছে?

 

-হাসনাত একটু হাসলেন। “আরে না মহামান্য যুবরাজ! এইটা তো পিওর ম্যানুয়াল লেবার। আমাদের ভলান্টিয়াররা সব জায়গায় আছে। আমরা ‘অপারেশন খেজুর’ নামে একটা টাস্কফোর্স করেছি। এয়ারপোর্টে নামার পর প্রতিটা কার্টন খোলা হয়েছে। এরপর আমাদের টিমের ছেলেরা গোল হয়ে বসে, হাতে গ্লাভস পরে, ১, ২, ৩ করে গুনেছে।”

 

-যুবরাজের গলায় এবার আতঙ্কের ছোঁয়া, ‘বলো কী! তিন কোটি খেজুর মানুষ হাত দিয়ে গুনেছে? কেন ভাই? স্কেলে মেপে নিলেই তো হতো!’

 

হাসনাত: স্কেলে মাপলে তো ট্রান্সপারেন্সি থাকে না যুবরাজ,‘হাসনাতের গলায় এবার সিরিয়াস সুর। অতীতে তো দেশে কেবল চুরিই হয়েছে। খেজুর আসত দেশের মানুষের জন্য, আর চলে যেত নির্দিষ্ট কিছু ভিআইপির ড্রয়িংরুমে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—এবার এক পিস আজওয়া বা মরিয়ম খেজুরও কেউ বিনা হিসাবে পকেটে ঢোকাতে পারবে না। আমি তো শিটে এটাও দিয়েছি যে, ৪৫২টি খেজুর বেশি শুকিয়ে গেছে আর ২৮টি খেজুরে পোকা পাওয়া গেছে।’

 

যুবরাজ: ‘হ্যাঁ, আমি শিটটা দেখেছি,’ এমবিএস আমতা আমতা করে বললেন, “সেখানে একটা কলাম দেখলাম ‘সিডলেস বা বিচিহীন’ নামে। ওইটার মানে কী?”

 

— ‘ওহ, ওইটা একটা ক্রিটিক্যাল ফাইন্ডিং!’ হাসনাত উৎসাহের সঙ্গে বললেন। ‘আশ্চর্যজনকভাবে ৭১২টি খেজুরের ভেতরে কোনো বিচি পাওয়া যায়নি। আমরা এটা নিয়ে আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। বিচিগুলো কি ট্রানজিটে কেউ বের করে নিয়েছে, নাকি এটা আপনাদের গাছের জেনেটিক ফল্ট—সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রিপোর্ট পেলেই আপনাকে মেইল করব।’

 

-সৌদি যুবরাজ রীতিমতো হতবাক। কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ নেই। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ! এসব নিয়েও তদন্ত কমিটি? ব্রাদার হাসনাত, তুমি জানো আমার আরামকো (সৌদি তেল কোম্পানি) বা আমার দেশের অ্যানুয়াল অডিটেও এত ডিটেইলস থাকে না!’

 

-হাসনাত বিনীতভাবে বললেন, ‘জি যুবরাজ, আমরা তো এখন রাষ্ট্র সংস্কার করছি। যেকোনো মেগা প্রজেক্টের চেয়ে আমাদের এই ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।’

 

এমবিএস হঠাৎ একটু উৎসাহিত হয়ে উঠলেন, “আচ্ছা ব্রাদার, তোমার এই ভলান্টিয়ারদের কি একটু রিয়াদে পাঠানো যাবে? আমার ‘নিওম (NEOM) সিটি’ প্রজেক্টের বাজেটে কিছু ঘাপলা মনে হচ্ছে। তোমার ছেলেরা যদি খেজুর গুনতে পারে, ওরা নিশ্চয়ই মরুভূমির বালুকণাও গুনতে পারবে! আর আমার তেলের ব্যারেলের হিসাবটাও ওরা ফোঁটায় ফোঁটায় গুনে দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। আমি ওদের দ্বিগুণ স্যালারি দেব!”

 

-হাসনাত হেসে ফেললেন। ‘অফারটার জন্য অনেক ধন্যবাদ যুবরাজ, কিন্তু আমার দেশের প্রতি আমার অনেক দায়িত্ব। আমার ছেলেরা এখন দেশের বাইরে যেতে পারবে না।’

 

যুবরাজ: কেন? এখন আবার কীসের হিসাব?

 

হাসনাত: সামনে ঈদ, হাসনাত সিরিয়াস হয়ে বললেন। এখন আমাদের জাকাতের কাপড়ের অডিট করতে হবে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী লুঙ্গির দৈর্ঘ্য সাড়ে চার হাতের জায়গায় চার হাত দিয়ে দেয়। আমরা এবার প্রত্যেকটা লুঙ্গির সুতার ঘনত্ব এবং দৈর্ঘ্য ইঞ্চি টেপ দিয়ে মেপে মেপে ডেটাবেজ বানাব। এরপর আবার ত্রাণের চালের বস্তা আছে। প্রতি কেজিতে কয়টা চাল আছে, আর তার মধ্যে কয়টা ভাঙা চাল—সেটাও গুনতে হবে।

 

যুবরাজ: মারহাবা! আপনার এই গল্প শুনে আমার বাবা (বাদশাহ সালমান) তো খুশি হয়ে বলছেন, ‘পরের বার খেজুরের সাথে কি কিছু উটও পাঠিয়ে দেব? হাসনাত কি উটের লোমও গুনে হিসাব দিতে পারবে?’

 

হাসনাত : ইনশাআল্লাহ যুবরাজ! আপনি উট পাঠান কিংবা দুম্বা, প্রতিটি পশমের হিসাব জনগণের সামনে থাকবে। আমরা সেই প্রজন্ম, যারা বিশ্বাস করি—জনপ্রতিনিধি মানেই চাবির গোছা হাতে রাখা পাহারাদার নয়, বরং জনগণের সেবক।

 

হাসনাত: জি যুবরাজ, ভালো থাকবেন। আর খেজুরের জন্য আবারও ধন্যবাদ।

 

ফোন রাখার ঠিক আগে সৌদি যুবরাজ তার পিএসকে আরবিতে কিছু একটা বলছিলেন। হাসনাত শুধু শেষ বাক্যটা শুনতে পেলেন, ‘খালিদ! লিখে রাখো, আগামী বছর থেকে বাংলাদেশে খেজুর পাঠানো দ্বীগুণ হবে। বাংলাদেশে এসব তরুণ নেতৃত্ব যেভাবে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাচ্ছে তাতে তাদের একটু সাপোর্ট দিলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে।’

 

হাসনাত তার স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্দেশে বললেন, এই শোনো, খেজুর তো ডান। এবার চালের বস্তাগুলো বের করো তো। ভাঙা চালের জন্য এক্সেল শিটে আলাদা কলাম অ্যাড করেছ?

 

হাসনাতের অফিসে আবার শুরু হয়ে গেল নতুন এক মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি।

 

[সতর্কীকরণ: হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সৌদি যুবরাজের ওপর লিখিত উপরোক্ত বিষয়টি স্যাটায়ার বা রম্য লেখা। পাঠকের বিনোদনের উদ্দেশে এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ারটি লিখেছে। বিষয়টি বাস্তব ভেবে পাঠককে বিভ্রান্ত না হতে সতর্ক করা হলো।]