আব্দুল্লাহ ফাহাদ আল-নাফিসি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ করে দেওয়ার মানেই যে দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন কাঠামো ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা ঠিক নয়। যারা এমনটা মনে করেন, তারা মূলত খুব ঠান্ডা মাথায় জিনিসটা চিন্তা করেননি।
তবে এটা সত্যি যে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ১৯৭৯ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। এবারের আঘাত নিঃসন্দেহে আগের আঘাতগুলোর চেয়ে কঠিন। প্রথমে প্রশ্ন ছিল, এই আঘাতের ফলে ইরানের শাসনকাঠামো ভেঙে পড়বে কি না? তবে যুদ্ধের ১৯তম দিনেও সেটি হয়নি। এখন বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইরানের শাসনকাঠামোটি কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যে এত কঠিন আঘাতও তারা সামলে নিল?
এখন পর্যন্ত যা তথ্য পাওয়া যায় সেটি ইঙ্গিত করে, শুরু থেকেই এই শাসনব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে এটি কোনো একক ব্যক্তির অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল না হয়—তা তিনি যত উচ্চপর্যায়েরই হোন না কেন।
ইসলামি রিপাবলিক অব ইরান অন্যান্য আরব দেশগুলোতে প্রচলিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো নয়, যেখানে শীর্ষ ব্যক্তি সরলেই পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। এটি একটি জটিল আদর্শিক ও নিরাপত্তানির্ভর ব্যবস্থা, যার শীর্ষে একজন ধর্মীয় নেতা থাকলেও তার নিচে রয়েছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের জাল। এরমধ্যে কিছু সংবিধানিক, কিছু নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট, কিছু আমলাতান্ত্রিক এবং কিছু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো একক ব্যক্তিকে নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে।
এই কারণে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা মানেই রাষ্ট্র মুছে যাওয়া নয়, কিংবা কেবল এই ঘটনার জেরে শাসনব্যবস্থাও ভেঙে পড়া নয়। এক্ষেত্রে বরং সংকটটি ‘নেতাকে বাঁচানোর’ প্রশ্ন থেকে সরে গিয়ে ‘অভ্যন্তরীণ সংহতির’ প্রশ্নে রূপ নেয়। এই সংহতি ধরে রাখার লড়াইটিই প্রকৃত ঝুঁকির জায়গা।
ইরানের সংবিধানটি ক্ষমতার শূন্যতার আশঙ্কা মাথায় রেখেই প্রণীত। দেশটির সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলে একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ সাময়িকভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবে এবং যত দ্রুত সম্ভব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নতুন নেতা নির্বাচন করবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা সাময়িকভাবে তিন সদস্যের একটি পরিষদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। এই তিন সদস্য হলেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আলিরেজা আরাফি। অন্যদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়ে গঠিত ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তো আছেই।
নেতার পদ শূন্য হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে, এ বিষয়ে এই স্পষ্টতা আসলে এক ধরনের ‘টিকে থাকার প্রোটোকল’, যা সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুহূর্তেও শাসনব্যবস্থা চালু রাখার সক্ষমতা তৈরি করে। তবে কেবল সংবিধানিক কাঠামো দেখেই বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এখানে ক্ষমতার ভারসাম্য তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তিনটি স্তরকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন, যেগুলো থেকে এই ব্যবস্থা তার শক্তি সঞ্চার করে।
প্রথম স্তর হলো ধর্মীয় বৈধতা, যা সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর, বিশেষজ্ঞ পরিষদ এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এই স্তরই নির্ধারণ করে কার হাতে বৈধতার সিলমোহর থাকবে। ফলে উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি একইসঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক।
দ্বিতীয় স্তর হলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত সামরিক কাঠামো, যার নেতৃত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)—যা শুধু সরকার নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার মেরুদণ্ড।
তৃতীয় স্তর হলো রাজনৈতিক আমলাতন্ত্র—অর্থাৎ সরকার, প্রেসিডেন্সি, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, যা রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখে এবং সামগ্রিক ভেঙে পড়া প্রতিরোধ করে।
এই তিন স্তরের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর নির্ধারক হলো আইআরজিসি।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, খামেনির হত্যার পর এখন আর ‘সংবিধানিক প্রক্রিয়া আছে কি না’ তা নয়, বরং ‘আইআরজিসি ঐক্যবদ্ধ থাকবে কিনা’ এটাই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই বাহিনী প্রেসিডেন্টের অধীন নয়, এটি কোনো প্রচলিত সেনাবাহিনীও নয়, বরং এটি বিপ্লবের প্রকৃত রক্ষক, যার হাতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুদ্ধ এবং শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যার পর আইআরজিসি দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং একটি আংশিক বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে, যাতে মধ্যম স্তরের নেতৃত্ব দ্রুত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
এর অর্থ, আঘাতটি মাথায় লাগলেও পুরো দেহ পঙ্গু হয়ে যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে এই যুদ্ধের ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বরং কিছু লক্ষণ তার বিপরীত দিকেই ইঙ্গিত করে। আদর্শিক রাষ্ট্রগুলো বহিরাগত অস্তিত্বগত হুমকির মুখে ভেঙে পড়ার বদলে আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে। সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ফলে শাসনকাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ার বদলে আরও কঠোর অবস্থান ও প্রতিরক্ষামূলক সংহতিও তৈরি করতে পারে।
বিদেশে অবস্থানরত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীর কিছু অংশ বলেছে, কেবল বোমাবর্ষণ শাসনব্যবস্থা পতন ঘটাতে পারবে না, প্রকৃত পরিবর্তন চাইলে সেটি অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করতে হবে। আর এটি শুধু হামলা করে সম্ভব নয়।
অবশ্য টিকে যাওয়ার মানেই যে নিরাপদ থাকা, তাও না। ইরানের ইসলামি শাসনতন্ত্র হয়তো টিকে যেতেও পারে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে এই কাঠামো হয়ে উঠবে ক্লান্ত, সতর্ক এবং আরও আত্মমুখী।
যুদ্ধ কেবল প্রতিরোধক্ষমতার পরীক্ষা নেয় না, এটি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও উন্মোচন করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো পুনর্গঠন করে। এমন পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থা সাধারণত নিরাপত্তামুখী পথ বেছে নেয়, নিজের ভেতরে সঙ্কুচিত হয়, সন্দেহ বাড়ায়, রাজনৈতিক পরিসর সংকীর্ণ করে এবং বিরোধীদের ‘টিকে থাকার প্রাচীরে সম্ভাব্য ফাটল’ হিসেবে বিবেচনা করে। এই প্রবণতা এরই মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে।
খবরে যেমনটা বলা হয়েছে, যুদ্ধের মধ্যে আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থিদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ঘনিষ্ঠ এবং তুলনামূলক সমঝোতাকামী গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামনে এসেছে। বিশেষ করে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টির পর।
শুরুতেই দেখা যায়, শাসনকাঠামো ভেতরের কিছু কট্টরপন্থী আলেম দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের পক্ষে চাপ দিচ্ছিলেন। এই পরিস্থিতি চলমান যুদ্ধে তিন সদস্যের পরিষদের হাতে ক্ষমতা থাকার বিষয়ে তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
এগুলো এখনও পতনের লক্ষণ নয়, তবে কাঠামোর ভেতরের উদ্বেগের ইঙ্গিত। অর্থাৎ, ইরানের বর্তমান সংকট শাসনকাঠামোর অস্তিত্ব নয়, বরং যে পরিবেশে এই কাঠামো কাজ করছে—যুদ্ধ, হত্যা, বহিরাগত চাপ, সামরিক ক্ষতি, এলিটদের ভেতরের বিভাজন এবং ভাঙনের আশঙ্কা—সেটিই মূল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোদ্দাকথা, এখন পর্যন্ত ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত পতনের মুখে হয়তো নেই, কিন্তু এটি আগের মতো অক্ষত অবস্থায় এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলেও মনে হয় না। সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো—ব্যবস্থা টিকে থাকবে, কিন্তু বড় মূল্য দিয়ে। আর তা হতে পারে, আইআরজিসির ওপর আরও নির্ভরতা, রাজনীতির জন্য কম জায়গা, বিরোধীদের প্রতি বেশি সংবেদনশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সঙ্কোচন।
সহজভাবে বললে, এই যুদ্ধ হয়তো শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটাবে না, কিন্তু এর যে সামান্য নমনীয়তা ছিল, সেটির অবসান ঘটাতে পারে। আর যখন শাসনব্যবস্থা নমনীয়তা হারায়, তখন বলপ্রয়োগে তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, আবার একই সঙ্গে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ও হতে শুরু করে। এটাই ইরানের বর্তমান দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি, পতন হয়নি, কিন্তু এক নতুন উদ্বিগ্ন কঠোরতার পর্যায়ে প্রবেশ করছে; যা আজ তাকে রক্ষা করতে পারে, আবার আগামীকাল দুর্বলও করে দিতে পারে।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও কুয়েতের সাবেক সংসদ সদস্য
আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে ‘হোয়াই দ্য ইরানিয়ান রেজিম ডিড নট কল্যাপ্স আফটার খামেনিস অ্যাসাসিনেশন’ শীর্ষক নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।