আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ঘটলেও সে তুলনায় আসছে না মূলধনি যন্ত্রপাতি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ১২.২০ শতাংশ। তবে এ সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩২.৪৭ শতাংশ। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না থাকায় নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে। উচ্চ সুদহার ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে ঋণপ্রাপ্তিও কঠিন হয়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বড় প্রকল্প না থাকায় মূলধনি যন্ত্রপাতির চাহিদাও কমেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের বদলে ব্যবসায়ীরা বিদ্যমান কার্যক্রম সচল রাখতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে মোট এক হাজার ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
তবে আমদানির এই প্রবৃদ্ধিতে মূলধনি পণ্যের অবদান নেই। বরং মূলধনি পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই খাতে আমদানি ছিল ২০০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৭৫ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে কমে ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। পরিস্থিতি ভালো থাকলে আমদানি বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে যে আমদানি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটি মূলত জ্বালানির কারণে। চলমান সংকটে নতুন করে কেউ এই খাতে বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। ফলে মূলধনি যন্ত্র আমদানির এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামালসহ মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৯.১৩ শতাংশ। এই খাতে আমদানি ৭১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ১১.৬ শতাংশ। তবে তুলা আমদানি কমেছে ৫.৬১ শতাংশ।
বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন আমার দেশকে বলেন, গত তিন বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। নতুন করে কোনো ধরনের মূলধনি বিনিয়োগ হচ্ছে না বললেই চলে। এর অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা। নির্বাচনের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং ব্যাংকিং খাতে অসহযোগিতামূলক মনোভাব ও তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত এ তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ বিতরণ হয়নি। মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে দেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়ন।
আবদুল্লাহ আল মামুন আরো বলেন, গত তিন-চার বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধন কমে গেছে। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো সক্ষমতা অনেক উদ্যোক্তার আর নেই।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৫-২০ দিন আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল, তবে সম্প্রতি তা প্রকট হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংকটের সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়েও তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এজন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান না হলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, ইউটিলিটি সুবিধা ছাড়া কোনো শিল্পকারখানা চালানো সম্ভব নয়। সরকার থেকে দুই বছরেও গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না—এমন বাস্তবতা জানিয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা এখন নতুন করে মেশিনারি এনে বিপদে পড়তে চাইছেন না।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করে উদ্যোক্তারা সাধারণত নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন বা কারখানা সম্প্রসারণ করে থাকেন। অর্থাৎ শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো বিনিয়োগ থমকে যাওয়া। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে না। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ঋণ প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি
গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। টানা কয়েক মাস ধরে এই হার এক অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণ চাহিদা কমে যায়। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় কারখানা সম্প্রসারণ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।