ক্ষুদ্র ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কর্মীদের আরও দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, স্বল্প ব্যয়ের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও স্বনিয়োজিত মানুষ ব্যবসা সম্প্রসারণ, পণ্য বিপণন, গ্রাহকসেবা এবং মজুত ব্যবস্থাপনার মতো কাজ আরও সহজে করতে পারেন। এতে কম অভিজ্ঞ কর্মীদেরও তুলনামূলক দক্ষতার কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ ভ্যালেন্টিনা ক্যালদেরন-মেজিয়া এসব কথা বলেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও স্বনিয়োজিত মানুষের ব্যবসা বাড়াতে ছোট এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ ফোন ব্যবহার করেও ব্যবসার মজুত ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের সেবা দেওয়া এবং বিপণনের কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞের এই বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহজলভ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ কর্মী ও স্বনিয়োজিত মানুষের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
কম খরচে প্রযুক্তির ব্যবহার
অনুষ্ঠানে ‘স্মল এআই’ বা ছোট এআই বলতে ব্যবহারিক, সাশ্রয়ী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য এআই প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের প্রযুক্তির লক্ষ্য হলো, বড় বিনিয়োগ বা জটিল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ছাড়াই মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে দৈনন্দিন কাজের উন্নতি করতে সহায়তা করা।
ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্যের মজুতের হিসাব রাখা, ক্রেতাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ এবং পণ্যের প্রচার চালানোর মতো কাজে এআই সহায়ক হতে পারে। এতে উদ্যোক্তারা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারবেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে উৎপাদনশীলতা বাড়লেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন চাকরি তৈরি হবে, তা নিশ্চিত নয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে নতুন কর্মীর চাহিদা তৈরি হতে পারে, আবার কিছু কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট পেশায় কর্মীর প্রয়োজন কমতেও পারে। ফলে এআইয়ের সুফল কাজে লাগাতে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা
অনুষ্ঠানের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় এআইয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ গোরিউনোভা বলেন, এআইয়ের কাজ হওয়া উচিত শিক্ষকদের সহায়তা করা, তাদের জায়গা দখল করা নয়।
তিনি বলেন, কম খরচে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে শেখার সহায়তা দেওয়া, পাঠ পরিকল্পনা তৈরি এবং শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি, সুরক্ষাব্যবস্থা এবং পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ফলাফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শিশুদের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও সতর্কতার কথা উঠে আসে। শিশুদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, শেখার আগ্রহ ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান এবং এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
তথ্যের সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এআই ব্যবহারে গ্রাহকের তথ্য, ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যক্রমের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন দক্ষিণ আফ্রিকার একজন অংশগ্রহণকারী।
এর উত্তরে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ সামীক্ষা খারে বলেন, পূর্ণাঙ্গ এআই-সার্বভৌমত্ব অর্জন ব্যয়বহুল হতে পারে এবং প্রযুক্তিগত বিভাজন বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি উন্মুক্ত মানদণ্ড, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং যৌথ অবকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের এসব বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, শিক্ষার মান এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্ব
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি, পোশাকশিল্প, ব্যাংক ও বীমাসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজলভ্য এআই ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা, বিপণন এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে পারেন। একইসঙ্গে কর্মীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো গেলে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংকের এই আলোচনা থেকে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনও নতুন কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা বা আর্থিক সহায়তা ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি; বরং আলোচনাটি দেখিয়েছে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এআইয়ের সুফল পেতে প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানের নেতৃত্বপর্বে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম এবং আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার মূল বিষয়, এআই কীভাবে মানুষের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।