পাবনার ঈশ্বরদীতে জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই যেন বদলে যায় প্রতিটি গ্রামের চিত্র। একের পর এক লিচুবাগান আর টকটকে লাল লিচুতে রঙিন হয়ে উঠেছে চারপাশ। মাঠ থেকে হাট—সব জায়গাই এখন পাকা লিচুর রঙে রঙিন। গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় লিচু। এ উপলক্ষে ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ এবং আত্মীয়স্বজনদের বেড়াতে আসা এক চিরায়ত ও আনন্দময় বাঙালি ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলাটিতে এবার ৪ হাজার ৬২৪ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০ হাজার মেট্রিক টন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
বাগান মালিক ও লিচু চাষিরা জানান, সবজি বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় লিচুতে লাভ অনেক বেশি। এ কারণে এখানে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের লিচু চাষ শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে একের পর এক লিচুবাগান গড়ে ওঠে। বর্তমানে উপজেলার দাশুড়িয়া, সলিমপুর, পাকশী, সাহাপুর ও লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে বোম্বাই, বোদানা, চায়না-৩ সহ বেশ কয়েকটি জাতের লিচু আবাদ করা হচ্ছে।
মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় এক মাসজুড়ে দেশি ও বোম্বাইসহ বিভিন্ন জাতের পাকা লিচু সংগ্রহ, বাছাই, গণনা ও বাজারজাতকরণের কাজ চলে। এ সময় রসালো লিচুর স্বাদ নিতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা এখানে বেড়াতে আসেন। ঈদের সময় যেমন মেয়ে-জামাই বেড়াতে আসেন, তেমনি লিচুর মৌসুমেও আসেন তারা। এটি এখন এ অঞ্চলের এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার আওতাপাড়া, সলিমপুর, পাকশী ও জয়নগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার লিচু বাগান ও হাট ঘুরে দেখা গেছে, তীব্র ও কড়া রোদের মধ্যে লিচুগাছের নিচে বসে লিচু গণনা ও ক্রেট ভর্তির কাজ করছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। দৈনিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরিতে এই কাজ করছেন তারা। ভোর ৬টার দিকে এসে সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন শ্রমিকরা।
এদিকে এই লিচু দেশব্যাপী সরবরাহ করতে ব্যবসায়ীরা ট্রাক, লেগুনা ও মিনিট্রাক নিয়ে আসছেন। লিচু সাজিয়ে দেওয়ার জন্যও রয়েছেন পৃথক শ্রমিক। আবার জয়নগর, সলিমপুর ও আওতাপাড়া হাটে দেখা যায়, রঙিন লিচু ডালিতে সাজিয়ে বসে আছেন বাগান মালিকরা। খুচরা ও পাইকারি ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। উপজেলাটিতে মোজাফফর বা দেশি লিচু, বোম্বাই ও চায়না-৩ লিচু বেশি চাষ হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে মোজাফফর জাতের দেশি লিচু বিক্রির মধ্য দিয়ে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে বাগান ও পাইকারি বাজারে বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচু মানভেদে প্রতি ১০০টি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি হাজার লিচু বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
মহিমা আক্তার নামের একজন লিচু শ্রমিক বলেন, এই মৌসুম আসলে লিচু গণনার কাজ করে সংসারে ভালোই আয় হয়। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে পাই, যা সংসারে বাড়তি জোগান দেয়। ভোর ৬টার দিকে এসে বিকেল ৫টার দিকে বাড়ি যাই। আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে কাজ করতে করতে দিন কেটে যায়।
উপজেলার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক ও লিচুচাষি ময়েজ উদ্দিন বলেন, এই মৌসুমে আমাদের ঈশ্বরদীতে যেন ঈদের মতো আমেজ তৈরি হয়। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ লিচুর বাগান দেখতে ও কিনতে আসেন। পরিচিত বন্ধুবান্ধবরাও বেড়াতে আসেন। এবার লিচুর ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকেরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। লিচু চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় অন্য ফসলের চেয়ে এখানকার মানুষ লিচু চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের লিচু চাষি আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের এলাকায় অন্য ফসলের চেয়ে লিচুই প্রধান অর্থকরী ফসল। এখানকার শতকরা ৮০ ভাগ জমিতেই লিচু বাগান। লিচুর মৌসুম এলেই আমাদের বাড়িতে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। জামাই-মেয়ে, নাতি-নাতনি, বোন, ভগ্নিপতির পাশাপাশি অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও এ সময় বেড়াতে আসেন।
লিচু চাষে জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল বলেন, ঈশ্বরদীতে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ায় সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। এখন প্রতিটি পরিবার ও বসতবাড়িতে লিচুর উৎসব চলছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ লিচু বাগান দেখতে আসছে। লিচুর ফলন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অনেকে স্বচক্ষে দেখে আনন্দিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে এসেছেন। তারা নিজ হাতে গাছ থেকে লিচু পেড়ে খাচ্ছেন। প্রতিটি পরিবারেই এখন উৎসবের আমেজ।
কথা হয় উপজেলার আওতাপাড়া গ্রামের লিচু ব্যবসায়ী মো. জলিল প্রামাণিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতেই আমি এখানে অবস্থান করে পাইকারিতে লিচু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাঠাই। প্রতিদিন জয়নগর ও আওতাপাড়া হাট থেকে ভোরে লিচু কিনে ক্রেটে ভরে এসব জেলায় সরবরাহ করি। গত বছরের তুলনায় এ বছর ব্যবসায় মোটামুটি লাভবান হতে পারব বলে আশা করছি। তবে গত কয়েকদিন বৈরী আবহাওয়া থাকায় ব্যবসা কিছুটা মন্দা গেছে। কারণ, লিচু কিনে পাঠালে রাতারাতি কালচে রঙ ধারণ করে, যার ফলে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যায়।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর প্রামাণিক বলেন, এ বছর ঈশ্বরদীতে চার হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার লিচুর ফলন বেশ ভালো হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ চলছে এবং তারা এ বছর অধিক লাভবান হতে পারবেন বলে আশা করছি।