Image description

স্ত্রীর নামে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন রংপুর নগরীর বুড়িরহাট এলাকার আনোয়ার হোসেন। আশা ছিল, কোরবানির ঈদে পশুর চামড়ার ব্যবসা করে দুটো পয়সা লাভ করবেন, ঋণের কিস্তিটাও শোধ হবে সহজে। চারজন সঙ্গী নিয়ে ঈদের দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে গ্রাম থেকে শতাধিক গরুর চামড়া কিনেছিলেন; গড়ে প্রতিটির দাম পড়েছিল ৫০০ টাকা। কিন্তু সেই চামড়া বিক্রি করতে এসে রংপুরের আড়তে আনোয়ারের চোখে এখন কেবলই জল। লাভ তো দূরের কথা, পুঁজির অর্ধেক টাকাই উধাও।

রংপুরের চামড়াপট্টিতে আনোয়ারের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। কারও সারাদিনের গাড়িভাড়া আর শ্রমিকের মজুরি জোটেনি, কেউবা মূলধন হারিয়ে রাতারাতি নিঃস্ব হয়েছেন। বিভাগীয় এই নগরীতে এবার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও খুচরা বিক্রেতারা। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে চামড়া নিয়ে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদারদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছামতো দাম ধরে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার দাম অন্তত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা হওয়ার কথা। অথচ আড়তদাররা তা কিনছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর খাসির চামড়ার তো এক টাকাও দাম নেই। ক্ষোভে-হতাশায় অনেকেই চামড়া আড়তে না বেচে রাস্তায় ফেলে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।

শনিবার ঈদের তৃতীয় দিনে নগরীর মডার্ণ মোড় এলাকা থেকে রিকশায় করে দুটি ছাগলের ও একটি গরুর চামড়া নিয়ে আড়তে এসেছিলেন জামাল উদ্দিন। আড়তদাররা ছাগলের চামড়া নিতেই চায়নি, বাধ্য হয়ে তা রাস্তাতেই ফেলে দেন তিনি। আর ৮৫ হাজার টাকায় কেনা কোরবানির গরুর চামড়াটি বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ৩০০ টাকায়। আক্ষেপ করে তিনি বললেন, '৮০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে এসে নিজের পকেট থেকে উল্টো লোকসান গুনতে হলো।'

একই করুণ চিত্র দেখা গেছে কাউনিয়ার আজিজুর রহমান, গঙ্গাচড়ার মাহফুজ আলী, তারাগঞ্জের লুৎফর রহমান ও দর্শনা এলাকার একরামুল হকের ক্ষেত্রেও। ৫০০ টাকা দিয়ে কেনা চামড়ার দাম ৩০০ টাকার বেশি মিলছে না কোথাও। অন্যদিকে, প্রতি বছর কোরবানির চামড়া বিক্রি করে যে এতিমখানা ও মাদরাসাগুলোর বড় অঙ্কের আয় হতো, এবার চামড়া তাদের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় একটি হাফিজিয়া মাদরাসার দায়িত্বে থাকা বাহারুল ইসলাম জানান, মানুষ অনেক চামড়া দান করলেও তিন দিনেও কোনো ক্রেতা মেলেনি। শেষমেশ নামমাত্র মূল্যে চামড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে।

রংপুরের প্রধান চামড়ার আড়ত শাপলাচত্বর সংলগ্ন কামারপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। প্রতি বছর এই সময়ে যে চামড়াপট্টি ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর থাকে, এবার সেখানে সুনসান নীরবতা। আড়তদারদের চামড়া কেনার ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই, অধিকাংশ গুদাম বন্ধ।

স্থানীয় আড়তদার মকবুল হোসেন এর পেছনে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, 'চামড়া সংরক্ষণ ও লবণের খরচ মিলিয়ে প্রতি চামড়ায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। তাই সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনা সম্ভব হচ্ছে না।'

তবে প্রবীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম এই সংকটের পেছনে ভিন্ন কারণ দেখছেন। তিনি জানান, বকেয়া টাকা আদায় না হওয়া ও পুঁজি সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের বড় ব্যবসায়ীরা এবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। এই সুযোগে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

তার ক্ষোভ, ট্যানারি মালিকরা সরকারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পেয়ে তা অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে, অথচ মাঠের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো ঋণসুবিধাই পাচ্ছেন না। ট্যানারির বাইরে চামড়া সংরক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় গত এক দশকের মধ্যে চামড়া শিল্পে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় আর কখনো দেখা যায়নি।