আর কয়দিন পরই ঈদুল আজহা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেনকে ঘিরে এবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালটাকার কারবারি চক্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, হাটের ভিড়, দ্রুত লেনদেন এবং বিক্রেতাদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জালনোট। শুধু অফলাইনেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ্যে চলছে ‘এ গ্রেড’ জালনোটের বিজ্ঞাপন, অর্ডার ও সরবরাহের প্রতিশ্রুতি। অভিযানে একের পর এক চক্র ধরা পড়লেও থামছে না জালনোটের বিস্তার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ভিড় ও দ্রুত লেনদেনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই আসল-নকল নোট যাচাই করা সম্ভব হয় না। তাদের মতে, জালনোটের বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। বাজারে জালনোট ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হন, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন এবং মুদ্রাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, জালটাকা চেনার উপায় সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। নোট হাতে নেওয়ার সময় জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা, রঙ পরিবর্তনশীল কালি এবং কাগজের গঠন পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহজনক কোনও নোট পাওয়া গেলে তা গোপন না রেখে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন। তাদের মতে, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতাই পারে জালটাকার বিস্তার রোধ করতে।
এদিকে সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ জালনোটসহ তিন জনকে আটক করেছে। এ সময় জালটাকা তৈরির তিনটি বিশেষ মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
শুধু ডিবিই নয়, র্যাবও একাধিক অভিযান চালিয়ে জালটাকা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের আটক করেছে। রাজধানীর মতিঝিলে অভিযান চালিয়ে র্যাব-৩ দুই যুবককে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে জালনোট তৈরির সরঞ্জাম, কম্পিউটার, স্ক্যানার, কালার প্রিন্টার এবং ২০ হাজার টাকার জালনোট উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া গত ১৮ মে মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে জালটাকা ও জালনোট তৈরির মেশিনসহ মো. সজিব হোসেন (৩০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। এ সময় তার কাছ থেকে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জালনোট, একটি ল্যাপটপ এবং জালটাকা তৈরির মেশিন জব্দ করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতার সজিব হোসেন একজন পেশাদার জালটাকা প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকার একটি বাসায় মেশিন বসিয়ে জালনোট তৈরি করছিলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত বরিশালের চৌমাথা এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে জালনোটের পিডিএফ ডিজাইন সংগ্রহ করতেন তিনি। পরে সেগুলো প্রিন্ট করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন।
র্যাবের ভাষ্য, সারা বছরই জালনোটের কারবার চালালেও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তিনি সরবরাহ বাড়ান। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জালনোট ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জালনোট সরবরাহকারী ও ডিলারদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালেও জালনোট তৈরি ও সরবরাহের অভিযোগে র্যাব-২-এর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন সজিব।
এদিকে গত ১৬ মে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার পৃথক দুটি অভিযানে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ টাকার জালনোটসহ তিন জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। বাহিনীটির দাবি, কোরবানির পশুর হাটে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নোটগুলো তৈরি করা হচ্ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এবারও কোরবানির পশুর হাটকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে জালটাকা চক্র। কারণ, এসব হাটে গভীর রাত পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ নগদ লেনদেন হয়। অতিরিক্ত ভিড় ও দ্রুত বেচাকেনার চাপে অনেক বিক্রেতা টাকা যাচাইয়ের সুযোগ পান না। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে চক্রটি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাসা, গ্যারেজ এবং আবাসিক ভবনে অস্থায়ী ছাপাখানা গড়ে তোলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জালনোট তৈরির কৌশলেও এসেছে আধুনিকতা। এখন আর শুধু সাধারণ স্ক্যানার বা ফটোকপি মেশিনের ওপর নির্ভর করছে না চক্রগুলো। উন্নতমানের প্রিন্টার, স্ক্যানার, কাটিং ডিভাইস এবং বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে নকল নোট। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, কিছু যন্ত্রাংশ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে দেশে আনা হচ্ছে। এছাড়া বিশেষ কাগজ, নিরাপত্তা সুতার মতো উপকরণ, হলোগ্রাম, রঙ পরিবর্তনকারী কালি এবং ইউভি কেমিক্যাল অনলাইন মার্কেট ও পাইকারি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে আসল নোট স্ক্যান ও ডিজাইন সম্পাদনার কাজও করছে চক্রের সদস্যরা।
গোয়েন্দাদের দাবি, পুরো নেটওয়ার্কটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। একটি দল নোটের ডিজাইন ও প্রিন্টিং করে, অন্য দল পরিবহন এবং আরেকটি দল বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পালন করে। আন্তজেলা কুরিয়ার সার্ভিস, বাস ও পণ্যবাহী যান ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে জালনোট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় জাল নোট চক্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালটাকার কারবারিরা। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পেজ খুলে প্রকাশ্যেই চলছে জালনোটের কেনাবেচা। দেওয়া হচ্ছে ‘এ গ্রেড’ জালটাকার বিজ্ঞাপন। অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ, অগ্রিম লেনদেন এবং কুরিয়ারে সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে বিস্তার লাভ করছে এই অপরাধ চক্র।
‘জালটাকা বানাই’, ‘জালটাকা বিক্রি করি’, ‘এ গ্রেড জাল নোট পাইকারি’, ‘টাকার শহর’, ‘জালটাকার বাজার’ কিংবা ‘জালটাকা বিক্রির ডিলার’ এমন বিভিন্ন নামে পরিচালিত হচ্ছে একাধিক পেজ ও গ্রুপ। তবে এসব পেজের পোস্ট ও ব্যবহারকারীদের মন্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জালনোটের এই কারবারেও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পোস্ট করা হচ্ছে আকর্ষণীয় ছবি ও ভিডিও।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পোস্টে দেখা গেছে, ৫০০ টাকার জালনোটের বান্ডিল ‘আনবক্সিং’ করে দেখানো হচ্ছে। ভিডিওতে বলা হয়, ‘জালটাকা আনপ্যাকিং দেখুন, একদম রিয়েল রিভিউ। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নতুনদের জন্য বিশেষ অফার চলছে।’ অন্য একটি ভিডিওতে সারি সারি জাল নোট কার্টনে প্যাকিং করার দৃশ্য দেখানো হয়। আবার কিছু পোস্টে প্রিন্টারের মাধ্যমে জালনোট ছাপানোর প্রক্রিয়াও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আইনের ফাঁক গলে বারবার জামিন
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইনের দীর্ঘসূত্রতা ও বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক জালটাকা কারবারি সহজেই জামিন পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
সিনিয়র আইনজীবী মঞ্জুর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জালটাকা সংক্রান্ত মামলায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মামলায় নির্ধারিত সময়সীমা মানা হয় না, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীও পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, জালনোট সংক্রান্ত এমন মামলাও রয়েছে, যা ৩০ বছর ধরে ঝুলে আছে। অনেক সময় আসামিপক্ষ কৌশলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে। উচ্চ আদালত নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিলেও নানা কৌশলে সেই সময় পার করা হয়। নির্ধারিত সময়ে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় অনেক আসামি সহজেই জামিন পেয়ে যান।
তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতার করা না গেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের আসামি করা হয়। এসব কারণেও আদালত থেকে সহজে জামিন মেলে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়ে যায়।
যা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
র্যাব-৪-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কেএন রায় নিয়তি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গাবতলী পশুর হাটে জালনোট শনাক্তে র্যাব কঠোর অবস্থানে থাকবে। জালনোট ছড়ানো কিংবা এ ধরনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত কাউকে সন্দেহ হলে গাবতলী হাটে থাকা র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে জালনোট চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে ডিবি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ইতোমধ্যে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান শুরু করেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ডিবির সাইবার ইউনিট নজরদারি জোরদার করেছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে জালনোট শনাক্তকরণ মেশিন বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি কন্ট্রোল রুম স্থাপন, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।