Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘদিনের নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়। আর তখন থেকেই একপ্রকার ক্ষমতার স্বাদ পেতে থাকে, যা চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার চূড়ায় ওঠে। তবে শেয়ারবাজারে বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারদর বাড়তে থাকে আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগ থেকেই বিএনপি-ঘরানার বলে পরিচিত কিছু কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়তে দেখা গেছে। এভাবে দাম বাড়াটা স্বাভাবিক বাজারের আচরণ নয়। এখানে একটি কারসাজি চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও ডিএসইর সার্ভিল্যান্স সিস্টেমে কারা এসব লেনদেনে জড়িত, তা শনাক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তারপরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

তথ্য বলছে, বিএনপির বিভিন্ন নেতার মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা, সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফকরুল ইসলামের মালিকানাধীন বা পরিচালিত কোম্পানি শেয়ারবাজারে রয়েছে।

এর মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টুর নিয়ন্ত্রণাধীন শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে— কে অ্যান্ড কিউ বাংলাদেশ, দুলামিয়া কটন, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ ছাড়া আফরোজা খানমের মুন্নু সিরামিক, মুন্নু অ্যাগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারি ও মুন্নু ফেব্রিকস, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের ঢাকা ব্যাংক, মিজানুর রহমান সিনহার একমি ল্যাবরেটরিজ, সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদের গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফকরুল ইসলামের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স রয়েছে।

এসব কোম্পানির মধ্যে ৯টি বা ৭৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে আওয়ামী সরকারের পতনের পর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে দর বেড়েছে দুলামিয়া কটনের। এ কোম্পানিটির ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ৫৭ দশমিক ১০ টাকার শেয়ারদর গতকাল সোমবার ১৩২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ দশমিক ৫০ টাকায়। এর পরের অবস্থানে থাকা কে অ্যান্ড কিউ বাংলাদেশের ২১০ টাকার শেয়ারদর ১২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭০ দশমিক ৫০ টাকায়। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ৪৭ দশমিক ৪০ থেকে ৭৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া ৬৯ দশমিক ১০ টাকার মুন্নু সিরামিকের শেয়ার ৫৪ শতাংশ বেড়ে ১০৬ দশমিক ৬০ টাকায়, ১৭ দশমিক ১০ টাকার মুন্নু ফেব্রিকসের শেয়ার ৩৫ শতাংশ বেড়ে ২৩, ১৩৬ দশমিক ১০ টাকার প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১৮৩ দশমিক ২০, ১০ দশমিক ৭০ টাকার ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার ১৩ শতাংশ বেড়ে ১২ দশমিক ১০, ৬৭ দশমিক ৬০ টাকার একমি ল্যাবরেটরিজের শেয়ার ১২ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ৮০ ও ২৮ দশমিক ১০ টাকার গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার ১২ শতাংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাজনৈতিক পালাবদলে এই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ারদরে প্রভাব পড়ে মূলত মনস্তাত্ত্বিক কারণে। বিনিয়োগকারীরা ভাবেন বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কোম্পানি বিভিন্নভাবে সমস্যায় পড়তে হয়, তবে তারাই যখন ক্ষমতায় আসে, তাদের কোম্পানি সুযোগ-সুবিধা পায়। এসব কারণে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কোম্পানি ব্যবসায় ভালো করবে বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা। তাই তারা ওইসব কোম্পানিতে বিনিয়োগে যান এবং শেয়ারদর বাড়ে।’

তিনি আরও বললেন, ‘সবসময় যে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো ব্যবসায় ভালো করবে, এমনটি নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীকেই সচেতন হতে হবে। কারণ একশ্রেণির চক্র আছে, যারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলই না, বিভিন্ন ইস্যুতে কারসাজির জন্য অপেক্ষা করে।’

ডিএসইর এই পরিচালকের কথার সত্যতা পাওয়া যায় দুলামিয়া কটন ও কে অ্যান্ড কিউয়ের শেয়ারদর অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে। কোম্পানি দুটির শেয়ারদর কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বলে ডিএসইর তদন্তেও উঠে এসেছে। এমনকি এ কোম্পানি দুটির কর্তৃপক্ষও তাদের শেয়ারদর বৃদ্ধিতে অবাক এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

জানা গেছে, গত বছরের আগস্টে দুলামিয়া কটন ও কে অ্যান্ড কিউয়ের শেয়ারদর বৃদ্ধি নিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ জানতে চেয়ে ব্যাখ্যা চায় ডিএসই কর্তৃপক্ষ। ডিএসইর ব্যাখ্যা তলবের উত্তরে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি দেখে তারা অবাক এবং উদ্বিগ্ন। কারণ তাদের অপারেশনাল বা কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। যাতে শেয়ারদর এভাবে বাড়ার কোনো কারণ নেই।

এমনকি কে অ্যান্ড কিউয়ের পর্ষদ বোনাস শেয়ার দিতে চাইলেও আর্থিক হিসাবে গরমিলের কারণে তা আটকে দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে কে অ্যান্ড কিউয়ের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৬ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করে, যা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণে সম্মতি দেয়নি বিএসইসি। পরে এ নিয়ে আপিল করেও সম্মতি পায়নি কোম্পানিটি।

এর কারণ হিসেবে বিএসইসি জানায়, অপর্যাপ্ত সংরক্ষিত মুনাফা ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিষয়ে নিরীক্ষকের আপত্তি।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ‘শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখাই কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ছে, সেগুলো নজরদারিতে রয়েছে। শেয়ারদর বাড়াতে প্রতারণামূলক বা কারসাজি হয়ে থাকলে বিএসইসি তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন কয়েকটি কোম্পানির তথ্য—

কোম্পানির নাম

শেয়ারদর (৫ আগস্ট ২০২৪)

শেয়ারদর (১১ মে ২০২৬)

উত্থান/পতন (%)

দুলামিয়া কটন

৫৭.১০

১৩২.৫০

১৩২%

কে অ্যান্ড কিউ

২১০.০০

৪৭০.৫০

১২৪%

প্রগতি ইন্স্যুরেন্স

৪৭.৪০

৭৪.০০

৫৬%

মুন্নু সিরামিক

৬৯.১০

১০৬.৬০

৫৪%

মুন্নু ফেব্রিকস

১৭.১০

২৩.০০

৩৫%

প্রগতি লাইফ

১৩৬.১০

১৮৩.২০

৩৪%

ঢাকা ব্যাংক

১০.৭০

১২.১০

১৩%

একমি ল্যাবরেটরিজ

৬৭.৬০

৭৫.৮০

১২%

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স

২৮.১০

৩১.৪০

১২%

মুন্নু অ্যাগ্রো

৪২৩.৭০

৩৪৮.২০

(১৮%)

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ

২৮.৯০

২১.০০

(২৭%)

ন্যাশনাল ব্যাংক

৬.৬০

৩.৯০

(৪১%)

দ্রষ্টব্য: ব্র্যাকেট চিহ্ন () দ্বারা নেতিবাচক পরিবর্তন বা দর পতন বোঝানো হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের কোম্পানির শেয়ারদর কমার মতো ঘটনাও আছে শেয়ারবাজারে। দেখা গেছে, আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিএনপি নেতাদের ন্যাশনাল ব্যাংক, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও মুন্নু অ্যাগ্রোর শেয়ারদর কমেছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬ দশমিক ৬০ টাকার শেয়ার সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৯০ টাকায় নেমে এসেছে। এ ছাড়া ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৮ দশমিক ৯০ টাকার শেয়ার ২৭ শতাংশ কমে ২১ টাকায় ও মুন্নু অ্যাগ্রোর ৪২৩ দশমিক ৭০ টাকার ১৮ শতাংশ কমে ৩৪৮ দশমিক ২০ টাকায় নেমে এসেছে।