বাংলাদেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি বহনকারী ছয়টি জাহাজ নিরাপদে চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে ইরান সরকার। তবে এর মধ্যে পাঁচটি চালানই ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা বাতিল করেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেহরানে পাঠানো তালিকাটি পুরোনো পরিকল্পনা ও নথির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল।
এসব নথিতে কাতারএনার্জি ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিংয়ের 'ফোর্স মেজর' ঘোষণা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই, মার্চের শুরুতে এই দুই প্রতিষ্ঠান সব সরবরাহ স্থগিত করে।
'অস্তিত্বহীন' চালান
জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো তালিকায় এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য পাঁচটি এলএনজি কার্গোর কথা উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে চারটি কাতারএনার্জির এবং একটি এক্সিলারেট এনার্জির।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আরফানুল হক নিশ্চিত করেছেন, এসব চালান এখন আর কার্যকর নয়। কারণ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্থগিতাদেশ অন্তত ৮ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
আরফানুল হক গতকাল টিবিএসকে বলেন, "যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই যেসব চালানের সরবরাহ বাতিল হয়ে গেছে, সেগুলোর জাহাজের তালিকা কেন ইরানে পাঠানো হলো, তা আমাদের জানা নেই।"
তিনি বলেন, "ফোর্স মেজরের কারণে এপ্রিল মাসে কাতারএনার্জির কোনো এলএনজি কার্গো নেই। তালিকাভুক্ত জাহাজগুলো কার্যত অস্তিত্বহীন।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ফোর্স মেজর কতদিন চলবে তা জানা না থাকায় তারা ভুল করে যুদ্ধ-পূর্ব আমদানির পরিকল্পনা অনুযায়ীই তথ্য পাঠিয়েছিল। তবে এ বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফোর্স মেজরের আওতায় থাকা জাহাজগুলোর তালিকা কেন জ্বালানি বিভাগ পাঠিয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, কিছু জাহাজ ফোর্স মেজরের আওতায় আছে, তবে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি এর আওতায় নয়।
তিনি বলেন, "তবে এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাহাজগুলো আনা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখতে আমরা পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছি।"
ইরানের অনুমোদন
গতকাল ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশের জ্বালানি বহনকারী ছয়টি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুপ্রতিম ও মুসলিম দেশ। বাংলাদেশিরা দুর্ভোগে পড়ুক, তা ইরান চায় না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।"
এর আগে ১৫ মার্চ জ্বালানি বিভাগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইরানের কাছে কূটনৈতিক সহায়তা চায়, যাতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামের অস্থিরতার মধ্যে হরমুজ পেরিয়ে বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
ওই চিঠিতে জ্বালানি বিভাগ উল্লেখ করে, মোট ৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী তিনটি চালান হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট।
ওই চিঠির পর ২৪ মার্চ ইরান হরমুজ প্রণালির সমস্যায় আটকে থাকা জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য চায়। পরদিন ২৫ মার্চ জ্বালানি বিভাগ নিরাপদ চলাচলের জন্য ছয়টি জাহাজের একটি বিস্তারিত তালিকা পাঠায়। এতে প্রায় ৫ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং প্রায় ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী জাহাজের তথ্য ছিল।
তালিকাটিতে জাহাজগুলোর লোডিংয়ের তারিখ, ধারণক্ষমতা, উৎস বন্দর এবং আইএমও শনাক্তকরণ নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য ছিল। এতে বোঝা যায়, তা তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রচলিত পরিকল্পনা নথি ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ফোর্স মেজরের কারণে এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এপ্রিল মাসের জন্য নির্ধারিত নয়টি কার্গোর মধ্যে আটটিই বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে কিনেছে।
জ্বালানি বিভাগ যে তালিকা পাঠিয়েছিল, তা মূলত এপ্রিল মাসের চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এর মধ্যে মাত্র একটি কার্গো পৌঁছানোর কথা ছিল মে মাসে। সব এলএনজি চালানই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতারএনার্জির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
কাতারএনার্জি ২ মার্চ ফোর্স মেজর ঘোষণা করে। এর পর ৫ মার্চ একই ঘোষণা দেয় ওমানভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড। পরে এই স্থগিতাদেশ কাতারএনার্জির ক্ষেত্রে ৮ মে এবং ওকিউ ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে ১০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এপ্রিলের জন্য এলএনজি কার্গো নিশ্চিত
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "এপ্রিলের জন্য আমরা নয়টি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করেছি। এর মধ্যে আটটি স্পট মার্কেট থেকে কেনা হচ্ছে। একটি আসবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীর কাছ থেকে, যা সম্ভবত অ্যাঙ্গোলা থেকে সংগ্রহ করা হবে।"
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ এখন উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এতে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে—যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মিজানুর রহমান বলেন, ইরানের আশ্বাসের পর তালিকাভুক্ত কার্গোগুলো যদি আসলেই পাওয়া যেত, তাহলে বাংলাদেশকে এত বেশি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হতো না।
তবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকটে পড়ে চলমান জ্বালানি কেনার ব্যাপারটি এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
মিজানুর রহমান বলেন, "আমরা স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট ইস্যু করেছি এবং চুক্তিসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন এসব স্পট চুক্তি বাতিল করার আর কোনো সুযোগ নেই।"
রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় চাইল বাংলাদেশ
এদিকে, জ্বালানি খাতে চাপ কমাতে রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
গতকাল এক বার্তায় জানানো হয়, মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে জ্বালানি দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুরোধ করা হয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ কৃষি মৌসুমের আগে কৃষকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
খলিলুর রহমান বলেন, সমুদ্রপথে রাশিয়ার তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে সীমিত বৈশ্বিক ছাড় আগে দিয়েছিল, বাংলাদেশ তখন তার সুবিধা নিতে পারেনি। কারণ সে সময় কোনো ট্যাংকারই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেনি।
বুধবার সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরে কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। প্রতি ব্যারেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ দশমিক ৪১ ডলার।
এক্সনমোবিল কাজাখস্তান ইনকের কাছ থেকে এ আমদানির অনুমোদন এসেছে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত কূটনৈতিক অগ্রগতিও নিশ্চিত করছে বাংলাদেশ।
এর আগে ১১ মার্চ সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের কাছে ভারতের মতো বাংলাদেশকেও রাশিয়ার তেল আমদানিতে সাময়িক ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানান।
জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, কাজাখস্তান থেকে বাংলাদেশের তেল কেনার প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
তিনি বলেন, এখন ওয়াশিংটন 'কেস-বাই-কেস' ভিত্তিতে মতামত দিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ না করেই রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহকারী ও বন্দর থেকেও বাংলাদেশ আমদানি করতে পারছে।