চলমান জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাজারেও। জ্বালানি সংকটে চালানি ব্যাপারীরা পড়েছেন পরিবহণ সংকটে। এ কারণে দালাল ফড়িয়া ব্যাপারীরা পেঁয়াজ চালান করতে পারছেন না রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বড় মোকামে। এর ফলে রাজশাহীসহ উত্তরের বিভিন্ন মোকামে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাজশাহীর কয়েকটি হাটবাজার ও মোকামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মণ দরে। সেই হিসাবে চাষিরা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছেন পৌণে ৪ থেকে ৫ টাকা করে।
চাষিরা বলছেন, দুই সপ্তাহ আগেও তারা প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও উত্তরের হাট বাজার ও মোকামে চাষিরা পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র পৌনে চার থেকে ৫ টাকা কেজি দরে।
রাজশাহীর বাগমারার চাষি আফসার আলী বলছেন, গত ১৫ বছরেও এতো অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির কোনো রেকর্ড নেই।
চাষিরা বলছেন, বাড়ি থেকে হাটে ও মোকামে পেঁয়াজ নিতে পরিবহণ খরচ হচ্ছে প্রতি মণে ৩০ টাকা। হাটে খাজনা দিতে হচ্ছে মণ প্রতি ৩০ টাকা। ফলে এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে চাষির পকেটে উঠছে মাত্র ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অথচ এক প্রতি মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলাতে চাষির খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। প্রতি বিঘায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের খরচ ৪৫ হাজার টাকা। চাষিরা এ বছর এক বিঘায় পেঁয়াজের ফলন পাচ্ছেন ৫৫ থেকে ৬০ মণ করে। অথচ মোকামে বিক্রি করছেন মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে। চাষিদের জন্য এটা এক অসহনীয় অবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীসহ উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের পেঁয়াজ প্রধান সাতটি জেলার হাটবাজার ও মোকামে নিত্য প্রয়োজনীয় এই কৃষিপণ্যটির অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। বর্তমানে চাষিরা জমি থেকে পুরোদমে পেঁয়াজ তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় চাষিরা অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে দ্রুত পেঁয়াজ তুলছেন জমি থেকে। নগদ টাকার প্রয়োজনে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা জমি থেকেই পেঁয়াজ কেটে-ছেঁটে নিকটবর্তী হাটেবাজারে ও মোকামে তুলছেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে মানভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। অনেকেই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি না করতে বাড়ির আঙিনায় পালা দিয়ে রাখছেন পেঁয়াজ। কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছেন না।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা বা আগাম জাতের পেঁয়াজের আবাদ হয় ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রাজশাহীর সর্বত্রই তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা আরও জানান, বর্তমানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠানো চলছে পুরোদমে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন শেষ হবে। এরপরই উঠতে শুরু করবে ছাঁচি বা দেশিজাতের পেঁয়াজ। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে রাজশাহীর তাহেরপুর, আলোকনগর, হাটগাঙ্গোপাড়া, দামনাশ, দুর্গাপুরের আলীপুর, পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, মোহনপুরের কেশরহাট, পবার খড়খড়ি ও নওহাটাসহ বিভিন্ন মোকামে অস্বাভাবিক কম দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দাম না পাওয়ায় চাষিরা হাটের ফাঁকা মাঠে পেঁয়াজ রেখে চলে যাচ্ছেন। কারণ পেঁয়াজ কেনার ক্রেতা পাচ্ছেন না।
রাজশাহীর বাগমারার সোনাডাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি সুজন কুমার শুক্রবার দুপুরে জানান, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ করেছিলেন। প্রতি বিঘায় ফলন পেয়েছেন গড়ে ৫৫ মণ করে। প্রতি বিঘাতে খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। পেঁয়াজ তুলে বাড়িতে পালা করে রেখেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, পেঁয়াজ কিছুটা পচনশীল পণ্য। ভরা মৌসুমে সহজলভ্য হওয়ায় মোকামে আমদানি বাড়ে। এতে পেঁয়াজের দাম পড়ে যায়। চাষিরা উৎপাদনসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে জমি থেকে তুলেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হাটে তোলেন। এই সুযোগটা কাজে লাগায় ফড়িয়া, দালাল ও মজুদদারেরা। কম দামে চাষির কাছ থেকে কিনে পেঁয়াজ গুদামে রাখেন। সরবরাহ কমে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা মুনাফা করেন।
পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানান, তিনিও শুনেছেন পেঁয়াজের দাম অনেক কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ আলু মাছসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য বিপুল পরিমাণে চালান হয়ে থাকে। বর্তমানে জ্বালানির কিছুটা সমস্যা থাকায় কৃষি পণ্য চালান ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি পণ্য চালানে নিয়োজিত পরিবহণ যাতে জ্বালানি পায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষনিউজ