Image description

তিন মাসের মাথায় চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং একীভূতকরণ কার্যক্রমে ধীরগতি—দুই সংকেতে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। পুনর্গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া গত সোমবার পদত্যাগ করেছেন। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তার এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সময়ে ব্যাংকটির একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আইটি ইন্টিগ্রেশনসহ সার্বিক প্রক্রিয়া বিলম্ব না করার নির্দেশ দেন। কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ব্যাংকের আলাদা তথ্যভান্ডার একত্রিত করতে গিয়ে সময় লাগছে।

ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে এই নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার নিচে আনা হয়।

উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্ত করা, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা এবং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর মধ্যে সরকার সরাসরি দেয় ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ জোগানের পরিকল্পনা করা হয়েছে আমানত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে।

তবে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি খেলাপি ঋণ। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি। ফলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের জমা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা।

আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ উত্তোলন সুবিধা চালু করেছে। এর আওতায় একজন গ্রাহক এককালীন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারছেন। বড় আমানতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর সীমিত পরিমাণে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইটি একীভূতকরণ। আলাদা সিস্টেম ও ডেটা একত্রিত করতে সময় লাগছে। ফলে গ্রাহকসেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বৈঠকে বলেন, সরকারের দেওয়া মূলধন ও আমানত বীমা তহবিলের সহায়তায় এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই একীভূতকরণ থেমে থাকার সুযোগ নেই।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—খেলাপি ঋণ কমানো, একীভূতকরণ দ্রুত শেষ করা, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ব্যাংকের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে কত দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় তার ওপর। কারণ, আস্থার সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পুরো ব্যাংক ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, বড় অঙ্কের সরকারি সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ সত্ত্বেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে পথ এখনো সহজ নয়। পুনর্গঠনের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।