মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের একটি সিম ব্যবহার করেন শিরিন পারভীন মনি। সিমটি তাঁর স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) নিবন্ধিত। সম্প্রতি এটি নিজের নামে নিবন্ধন করতে গিয়ে শিরিন জানতে পারেন, তাঁর এনআইডি দিয়ে ইতোমধ্যে ১০টি সিম নিবন্ধন করা হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আইন অনুযায়ী, বর্তমানে একজন গ্রাহক নিজের এনআইডি দিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি সিম নিবন্ধন করতে পারবেন। শিরিন বলেন, ‘আমি নিজের এনআইডি ব্যবহার করে কখনও কোনো সিম কিনি নাই। তাহলে ১০টা সিম রেজিস্ট্রেশন করলো কে?’
শুধু শিরিন নন, দেশের অনেক নাগরিকের অজান্তে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এভাবে নিবন্ধন করা হয়েছে সিম। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, গ্রাহকের অজান্তে সিম রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অজান্তে এনআইডি ব্যবহার, বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) জালিয়াতি, অনুমতি ছাড়া সিম সক্রিয়করণ ও সিম রিপ্লেসমেন্ট।
সংস্থাটি বলছে, বিভিন্ন অপরাধী চক্র এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে সিম নিবন্ধন করে। পরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সময় ওই সিমগুলো ব্যবহার করে। এতে অপরাধী শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেরি হয়। অনেক সময় এনআইডির মালিক অপরাধী না হয়েও হেনস্তার শিকার হন।
সিম জালিয়াতির ঘটনায় আরেক ভুক্তভোগী ফারহানা লিমা। তিনি স্ট্রিমকে জানান, ২০০৯ সালে এয়ারটেলের দুটি সিম কেনেন তাঁর বোন ফারজানা ববী লিজা। এই মধ্যে একটি লিজা নিজে এবং অন্যটি তিনি ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে সিম দুটি নিবন্ধনও করেন লিজা।
ফারহানা লিমা বলেন, ‘আমার সিমটা বোনের এনআইডি দিয়ে নিবন্ধন করা। হঠাৎ একদিন দেখি সিমটা বন্ধ হয়ে গেছে। পরে কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে জানতে পারি, আমার বোনের নামে ১০টি সিম নিবন্ধন করা হয়েছে। তাই আমার বন্ধ হয়ে যাওয়া সিমটি আবার সচল করতে বোনকে আসতে হবে। কিন্তু আমার বোন থাকেন আমেরিকায়।’
বাংলালিংকের আরেক গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘শুনেছি সিম কেনার সময় রিটেইলাররা (সিম বিক্রেতা) একাধিকবার বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) নিয়ে অন্যান্য সিম নিবন্ধন করে। কিন্তু আমি তো কখনও সিমই কিনি নাই। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব হলো।’
বায়োমেট্রিক জালিয়াতি হয় কীভাবে
বায়োমেট্রিক জালিয়াতি হলো মানুষের শারীরিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য (আঙুলের ছাপ, মুখমণ্ডল, চোখের আইরিস, কণ্ঠস্বর) চুরি বা নকল করে প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহার।
বাংলাদেশে সিম কেনার সময় এনআইডির পাশাপাশি আঙুলের ছাপ দেওয়া বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বিভিন্ন উপায়ে বায়োমেট্রিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সার্ভার নষ্টের অজুহাত।
সংস্থাগুলো বলছে, কেউ যখন সিম কিনতে যান, তখন গ্রাহকের অজান্তে একাধিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয় কিছু বিক্রেতা (রিটেইলার)। এটা করতে তাঁরা ‘আঙুলের ছাপ মেলেনি’ বা ‘সার্ভার কাজ করছে না’-এর মতো অজুহাত দেন। তবে প্রথমবারের ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়েই সিম নিবন্ধিত হয়। পরেরগুলো দিয়ে অন্য সিম নিবন্ধন করেন বিক্রেতারা।
বিটিআরসি নির্ধারিত অ্যাপের বাইরেও অবৈধভাবে গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করেন অনেক রিটেইলার। এছাড়া বায়োমেট্রিক ক্লোনিং বা সিলিকন হাতের ছাপ দিয়ে বায়োমেট্রিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বায়োমেট্রিক ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রে অপরাধী চক্র সিলিকন বা বিশেষ আঠা দিয়ে মানুষের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। পরে তা দিয়ে নকল ছাপ তৈরি করা হয়। এর বাইরে জমি রেজিস্ট্রি অফিস বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেও আঙুলের ছাপের তথ্য লিক হয়। সেই তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীরা বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে। পরে এসব সিম মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্ট্রিমকে বলেন, বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধিত সিম দিয়ে বিভিন্ন অপরাধ সংঘঠিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ/রকেট) প্রতারণা, ওটিপি হাইজ্যাক করে অর্থ চুরি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি ব্যবহার, সাইবার প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিং, মানবপাচার ও জঙ্গি যোগাযোগে ব্যবহার, অনলাইন জুয়া ও চাঁদাবাজি, ভুয়া কলসেন্টার ও ভয়ভীতি দেখানো।’
যোগাযোগ করা হলে বিটিআরসির উপ-পরিচালক (মিডিয়া) জাকির হোসেন খাঁন স্ট্রিমকে বলেন, ‘কোনো বিক্রেতা সিম জালিয়াতি করছেন সন্দেহ হলেই তাদের রিটেইলারশিপ তাৎক্ষণিক স্থগিত বা বাতিল করা হয়। সেইসঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অপারেটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়।’
বিপদ হতে পারে এনআইডি মালিকের
সিম জালিয়াতি নিয়ে কাজ করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। সংস্থাটি বলছে, সাইবার ক্রাইম সংগঠিত হলে প্রথমে সিম নির্দিষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। পরে সেই সিম থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বের করা হয়। এ কারণে অন্যের এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা সিম ব্যবহার হলে প্রকৃত আসামি ধরতে বেগ পেতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাইবার পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ট্রিমকে বলেন, ‘অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে সিম নিবন্ধন করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিজেকে গোপন করা। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিকভাবে প্রকৃত অপরাধী ধরতে ব্যর্থ হন। অনেক সময় এনআইডির নিরীহ মালিক আটক হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃতি অপরাধী আইনের আওতায় আসার আগ পর্যন্ত এনআইডি মালিক সন্দেহের তালিকায় থাকেন। কারণ, সিমটি তাঁর নামে নিবন্ধিত। ফলে, নানাভাবে তিনি হেনস্তার শিকার হতে পারেন।’
যা বলছে সিম কোম্পানিগুলো
দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো জানিয়েছে, তাঁরা প্রায়শ এমন অভিযোগ পান। গ্রাহকের অজান্তে অন্য কেউ সিম রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেন। এমন অভিযোগ পেলে তাঁরা দ্রুত অবৈধ সিম বন্ধের উদ্যোগ নেয়।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী স্ট্রিমকে বলেন, ‘সিম জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ামাত্র গ্রামীণফোন বিষয়টি যাচাই করে। প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট সিম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় বায়োমেট্রিক যাচাই, তথ্য সংশোধন, সিম বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আলোকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
রবি আজিয়াটা পিএলসির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের অজান্তে সিম নিবন্ধনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিষয়টি এখন আর গ্রাহক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, অনেক সময় বিকল্পভাবেও এ ধরনের জালিয়াতি হয়ে থাকে। তবে এনআইডির মাধ্যমে সিম জালিয়াতির বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং এনআইডি কর্তৃপক্ষকে জানাই। এ বিষয়ে আরও কাজ করা হচ্ছে।’
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে জানতে বাংলালিংকের প্রধান অফিসে গেলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইন কী বলে
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০১ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী, অবৈধ উপায়ে সিম নিবন্ধন, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি শাস্তিমূলক অপরাধের আওতায় পড়ে। এর জন্য বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রয়েছে। এই জালিয়াতিতে সহায়তাকারীও অপরাধী বলে বিবেচিত হন।
এ বিষয়ে সিআইডির কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন খান স্ট্রিমকে বলেন, সিম বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির অভিযোগ পেলে সিআইডি প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে। এর অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরের সিডিআর বিশ্লেষণ করে। এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করে অপারেটরের মাধ্যমে সিম ব্লক বা রিকভার করে। এছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তের নামে মামলার পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়।
জালিয়াতি বন্ধে পদক্ষেপ
বায়োমেট্রিক জালিয়াতি বন্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপ-পরিচালক (মিডিয়া) জাকির হোসেন খাঁন স্ট্রিমকে বলেন, জালিয়াতি ঠেকাতে বিটিআরসি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বিক্রেতাদের পরিচয় নিশ্চিত প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের টিসিএপি (ট্রানজেকশন ক্যাপাবিলিটিস অ্যাপ্লিকেশন পার্ট) আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।
এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন খান স্ট্রিমকে বলেন, সিম জালিয়াতি প্রতিরোধে মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে সিআইডি। সেইসঙ্গে বিটিআরসির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান, সন্দেহভাজন সিম মনিটরিং, সাইবার পুলিশ সেন্টারের সহায়তা, জনসচেতনতা কার্যক্রমসহ নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে।’
সুরক্ষা ও করণীয়
নিজের এনআইডি দিয়ে কয়টি সিম নিবন্ধন হয়েছে তা জানান পরামর্শ দিয়েছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। সংস্থাটি বলছে, আপনার এনআইডি অবৈধ উপায়ে অন্য কেউ ব্যবহার করছে কিনা, সে ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে।
যেকোনো মোবাইল ফোন নম্বর থেকে *16001# ডায়াল করে গ্রাহক এই তথ্য জানতে পারবেন। *16001# ডায়াল করার পর একটি পপ-আপ বক্স আসবে, সেখানে গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের শেষ চারটি সংখ্যা লিখে ‘সেন্ড’ করতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ফিরতি এসএমএসে ওই এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ও নম্বরগুলোর দেখা যাবে।
সরকারি সংস্থা ও সাইবার পুলিশ সেন্টার বলছে, সিম জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য গোপন রাখা, অপ্রয়োজনীয় সিম বন্ধ করা, সিম রিপ্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে নিজে উপস্থিত থাকা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দ্বি-স্তর নিরাপত্তা ব্যবহার, সন্দেহজনক কল অথবা লিংক এড়িয়ে চলা।
জালিয়াতির শিকার হলে দ্রুত জাতীয় সুরক্ষা সেবা নম্বর ৯৯৯ এবং সিআইডি বা সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ জানানোর পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।