Image description

সময় মানুষের জীবনের এমন এক সম্পদ, যা একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না। অথচ ডিজিটাল যুগে সময় বাঁচানোর প্রযুক্তি হাতে নিয়েও আমরা ক্রমশ সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ অনুযায়ী একের পর এক কনটেন্ট সামনে আনে। কয়েক মিনিটের অবসর কখন যে দীর্ঘ সময়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে পরিণত হয়, তা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, নাকি অজান্তেই সময়ের মূল্য ভুলিয়ে দিচ্ছে?

ইসলাম সময়কে শুধু দৈনন্দিন কাজের হিসাব হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে মানুষের দায়িত্ব, আমল ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করে। পবিত্র কোরআনের ১০৩ নম্বর সুরা আল-আসরে আল্লাহ সময়ের শপথ করে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে; তবে যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়, তারা ব্যতিক্রম।’ (সুরা আল-আসর : ১-৩) এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় অতিবাহিত হওয়াই বড় কথা নয়; সেই সময় কী কাজে ব্যয় হচ্ছে, সেটিই প্রকৃত বিবেচ্য।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম মানুষের পছন্দ, অনুসন্ধান ও দেখার অভ্যাসের ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট সুপারিশ করে। ফলে একটি ভিডিও থেকে আরেকটি ভিডিওতে যেতে যেতে আমরা অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য ভুলে যাই। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষা ও যোগাযোগের জন্য প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে উপকারী। কিন্তু উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, অনলাইন বিতর্ক, অন্যের জীবন নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল এবং ক্ষণস্থায়ী বিনোদনে দীর্ঘ সময় ব্যয় আমাদের পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক, ইবাদত ও আত্মোন্নয়নের সময় সংকুচিত করতে পারে। অ্যালগরিদম মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু সেই মনোযোগ কোথায় ব্যয় করা উচিত, তার দায়িত্ব আমাদেরই।

 

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি : ৬৪১২) অবসর যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত, এই হাদিস তা স্পষ্ট করে। অথচ আমরা অবসর পেলেই আত্মসমালোচনায় বসি না; বরং পর্দার পর্দায় হারিয়ে যাই। সারাদিন কী দেখলাম, কত তথ্য জানলাম, কত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, তার হিসাব রাখি; কিন্তু কতটা শিখলাম, কী ভালো কাজ করলাম, কার উপকারে এলাম কিংবা নিজের চরিত্রে কী পরিবর্তন আনলাম, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাই।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহকে ভয় করতে এবং প্রত্যেকের আগামী দিনের জন্য সে কী পাঠিয়েছে, তা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে (সুরা আল-হাশর : ১৮) এই নির্দেশ আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রতিদিনের শেষে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমার সময় কি জ্ঞান অর্জন, সৎকর্ম ও দায়িত্ব পালনে ব্যয় হয়েছে, নাকি শুধু পর্দার আলোয় নিঃশেষ হয়েছে? আত্মসমালোচনা মানে শুধু ভুলের অনুশোচনা নয়; ভুল শনাক্ত করে নিজেকে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াও।

 

বলাবাহুল্য, সমাধান প্রযুক্তি বর্জন নয়, বরং সচেতন ও সংযত ব্যবহার। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় নির্ধারণ, সালাত ও পড়াশোনার সময় ফোন দূরে রাখা এবং প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন পাঠ, জ্ঞানচর্চা ও আত্মসমালোচনায় ব্যয় করা জরুরি।

 

মনে রাখতে হবে, অ্যালগরিদম আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পারে না। প্রযুক্তির গতি যত বাড়ুক, বিবেকের বিচার যেন থেমে না যায়। কারণ, সময়ের অপচয় শুধু ঘড়ির কাঁটার ক্ষতি নয়; এটি দায়িত্ব, সম্ভাবনা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ হারানোও। একদিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে—এই বিশ্বাস আমাদের সময় ব্যবহারে আরো সচেতন করতে পারে। প্রশ্ন তাই শুধু সময় কোথায় গেল, তা নয়; বরং সেই সময়ের হিসাব দিতে আমরা কতটা প্রস্তুত?

 

লেখক: আফিয়া আলম, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া