Image description
একসময় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব হবে প্রযুক্তিতে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই যাত্রা শুরু করে হাইটেক পার্ক। ব্যয় হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। ছিল বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং লাখ লাখ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন। কিন্তু ১৫ বছর পর এসে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। কোথাও ফাঁকা পড়ে আছে ভবন, কোথাও অচল অবকাঠামো। আবার কোথাও ব্যয়ের হিসাব নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
 
ডিজিটাল বিপ্লবের আড়ালে আসলে কী ঘটেছে? কারা লাভবান হলো? আর এই বিপুল ব্যয়ের হিসাবই বা দেবে কে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধান করেছে স্টার নিউজ।
 
২০১০ সাল। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ তখন শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
 
এরপর এক দশকেরও বেশি সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ও আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার। কাগজে-কলমে এসব অবকাঠামো হয়ে ওঠার কথা ছিল বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিপ্লবের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে? হাইটেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নামে স্টার নিউজ।
 
স্টার নিউজের প্রথম গন্তব্য গাজীপুরের কালিয়াকৈর। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রকল্প কালিয়াকৈর হাইটেক সিটি। ২৩২ একর জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রকল্পটি বর্তমানে বিস্তৃত হয়েছে ৩৭১ একরজুড়ে। কাগজে-কলমে এটি দেশের প্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রকল্প।
 

পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকল্পের প্রবেশপথে দাঁড়ালেই দেখা মেলে ভিন্ন বাস্তবতার। প্রযুক্তি শিল্পের প্রতীক হওয়ার কথা যে অবকাঠামোর, সেখানেই ভাঙাচোরা রাস্তা। অচল সড়কবাতি, অযত্নে পড়ে থাকা স্থাপনা। চারদিকে যেন বিরাজ করছে গা ছমছমে নীরবতা। স্টার নিউজের উপস্থিতির খবর পৌঁছাতেই শুরু হয় রাস্তা মেরামতের কাজ। প্রশ্ন হলো, এসব কি কেবল রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা?

 
প্রকল্পের একজন মেরামতকর্মী জানান, প্রকল্পটির রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে গাফিলতি রয়েছে।
 
এ বিষয়ে স্টার নিউজ হাই-টেক সিটির সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের সঙ্গে কথা বলে। তিনি সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয়টি কেন করা হয়নি, তা আগে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের জিজ্ঞেস করুন।’
 
পার্কের অব্যবস্থাপনার আরেক নমুনা, মূল ভবনের সামনে পড়ে থাকা একটি বাসের ধ্বংসাবশেষ। প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার কোটি টাকার একটি জাতীয় প্রকল্পে এমন সংকট তৈরি হলো কেন? নাকি এটি আরও বড় সমস্যার ইঙ্গিত? স্টার নিউজের হাতে এসেছে একাধিক সরকারি নথি। যেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সরঞ্জাম কেনা; প্রায় প্রতিটি স্তরেই রয়েছে ভয়াবহ দুর্নীতির গল্প।
 
নথি বলছে, হাইটেক পার্কে স্টাফদের যাতায়াতে দুটি বাস কেনা হয় ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়। অথচ ঠিক একই মানের টাটা বা অশোক লেল্যান্ড বাস বাজারে পাওয়া যায় মাত্র ৩০ লাখ টাকায়। যার একটি নষ্ট, আরেকটি ভাড়া দেয়া হয়েছে বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের কাছে।
 

চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য হলো, ১৮ লাখ টাকা দামের একটি ৫০০ কেভিএ ট্রান্সফরমার বসাতে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া প্রিমিয়াম মডেলের লিফটের দাম যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা; সেখানে পার্কের জন্য কেনা একটি লিফটের বিল করা হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। একটি ব্রিজ নির্মাণে খরচ করা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। কিন্তু এর চুক্তিমূল্য ৬ কোটি টাকা। অর্ধেক টাকাই অন্যের পকেটে।

Advertisement
 
 
কালিয়াকৈর হাই-টেক সিটির এই যখন পরিস্থিতি, তখন এখানে বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বাড়ছে হতাশা। যাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এই অবকাঠামো, তাদেরই কেউ কেউ এখন প্রশ্ন তুলছেন সেবার মান নিয়ে।
 
ফেলিসিটি ইন্টারনেট ডেটা সেন্টারের সিইও শারফুল আলম জানান, ‘আইনের ফাঁক ব্যবহার করে বাইরের কিছু বিল্ডিংকে হাইটেক পার্কের সুবিধা দেয়া হয়েছে। যে আশা নিয়ে ইনভেস্টররা এখানে আসেন, অনেক সময় সেই আশা পূরণ হয় না।’
 
স্টার নিউজের এবারের গন্তব্য চায়ের দেশ সিলেট। যা সিলেট হাই-টেক পার্ক বা সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি। কোম্পানীগঞ্জের বর্ণি এলাকায় ১৬৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মেগা প্রকল্প। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকার মতো। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শহর থেকে অন্তত ৩০ কিলোমিটার দূরে জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা হয় সিলেট হাইটেক পার্ক।
 

এই পার্কের ভেতরে দুই তলা দুটি ভবনে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি—তাদের অস্তিত্ব শুধু কাগজেই আছে। এখানেই শেষ নয়। পৌনে দুই কোটি টাকার ভবনে আসবাবও নষ্ট। ভেতরে জমে রয়েছে ময়লার ভাগাড়। ভবনের সামনে ফোয়ারার পানিতে চাষ হচ্ছে মাছ। পার্কে এখন অবাধে চরছে গরু-ছাগল, আর একাধিক জায়গায় ভাঙা সীমানাপ্রাচীর।

 
পার্কের ৪৩ একর জমি স্টল বরাদ্দ দেখানো হলেও, একমাত্র র‍্যাংস ইলেকট্রনিক্স ছাড়া কেউ বিনিয়োগ করেনি। পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে সংশয় এই কর্মকর্তার।
 
র‍্যাংস ইলেকট্রনিক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মোরশেদুল আলম জানান, হাইটেক থেকে বলা হয়েছে ফাস্ট যেটা বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছি, সিকিউরিটি হিসেবে এগুলো ইনসিওর করা হবে। আপনি জানেন, আমরা এখন পর্যন্ত গ্যাসের কানেকশন পাইনি। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টিতে তো বিদ্যুৎ থাকেই না। এরপর হাইটেকের সাবস্টেশনে কেন সমস্যা হলে তাহলে এক থেকে দেড় দিন বিদ্যুৎ থাকে না। এমনকি দুই দিন পর্যন্ত পাওয়ার থাকে না।
 
র‍্যাংস ইলেকট্রনিক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মোরশেদুল আলম জানান, হাইটেক পার্ক থেকে বলা হয়েছে, প্রথমত আমরা যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো নিশ্চিত করা হবে। আপনি জানেন, আমরা এখন পর্যন্ত গ্যাসের সংযোগ পাইনি। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময় তো বিদ্যুৎ থাকেই না। এরপর হাইটেক পার্কের সাবস্টেশনে কোনো সমস্যা হলে এক থেকে দেড় দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এমনকি কখনও কখনও দুই দিন পর্যন্তও পাওয়ার থাকে না।
 
নথি ঘেঁটে মিলেছে আরও ভয়াবহ জালিয়াতির প্রমাণ। একটা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, যার দাম আড়াই কোটি টাকা; তার বিল তোলা হয়েছে ১৮ কোটি টাকারও বেশি। জমি লিজ বাবদ প্রাপ্ত ৫৬০ কোটি টাকার কোনো হদিসই নেই সরকারি নথিতে।
 

ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসাতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ দেখানো হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, যেখানে বাস্তব দর ছিল ২০ হাজার। কালভার্ট ও স্লুইচ গেট নির্মাণেও খরচ হয়েছে প্রাক্কলনের আড়াই গুণ বেশি।

 
স্টার নিউজের অনুসন্ধান বলছে, সিলেট ইলেকট্রনিক্স সিটির আগাগোড়াই ছিল দুর্নীতি আর লুটপাটের প্রকল্প। যার প্রমাণ মেলে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায়।
 
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা আছে, সিলেট হাইটেক সিটির জন্য নির্ধারিত জায়গাটির পুরোটাই জলাভূমি এবং দুর্গম হওয়ায়, সাফল্যের সম্ভাবনা সামান্য। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবনায় রহস্যজনকভাবে সমীক্ষার আপত্তিগুলো বাদ দেওয়া হয়। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, কোন আইনে জলাভূমিতে এমন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হলো?
 
এ বিষয়ে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির পরিবেশ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল বলেন, যিনি পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়েছেন, তিনি হয়তো একটি চাপের মধ্যে পড়ে সেটি দিয়েছেন। এখানে একটি বিষয় লেখা ছিল যে, একটি কম্প্রিহেনসিভ ইআইএ রিপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু এখানে কম্প্রিহেনসিভ রিপোর্ট আর দেখা যায়নি। এখানে শুধু সরকারি অর্থেরই অপচয় হচ্ছে না, পরিবেশেরও অপচয় হচ্ছে এবং স্বপ্নেরও অপচয় হচ্ছে।
 
সিলেট হাইটেক পার্কের ভূমি অধিগ্রহণ আর মাটি ভরাটের মতো মৌলিক কাজেও হাত ছিল ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠদেরই। যাদের অন্যতম সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম।
 
এই পার্কে দেড়শ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে, শুধু মাটি ভরাট, সীমানাপ্রাচীর আর বৃক্ষরোপণের নামে। সরেজমিনে নদীর পাড়ে গিয়ে কোনো বৃক্ষের চিহ্ন পাওয়া গেল না।
 
অর্থ লোপাটের আরেকটি নমুনা হলো, পার্কের প্রবেশপথের এই দেয়াল; যেখানে একসময় ছিল বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল। এই ম্যুরাল তৈরিতেই পার্ক কর্তৃপক্ষ খরচ দেখিয়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
 
সিলেট ইলেকট্রনিক্স সিটির সাবেক উপপরিচালক এস এম আল মামুন। বর্তমানে যিনি হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর দায়িত্বে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলকের ঘনিষ্ঠ মামুন প্রাক্কলন ও মূল্যায়ন কমিটিতে নিজের লোক বসিয়ে; নির্দিষ্ট কয়েকটি লাইসেন্স দিয়ে বাগিয়ে নিতেন ঠিকাদারির সব কাজ।
 

মামুনের মুখোমুখি হয় স্টার নিউজ। কিন্তু ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।

 
সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এস.এম. আল-মামুন বলেন, আপনি ইলিগাল কথা বললে আপনার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। পিটির বাইরে আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা আছে। মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে।
 
সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এস.এম. আল-মামুন বলেন, আপনি যদি ইলিগ্যাল কথা বলেন, তাহলে আপনার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। পিটির বাইরে আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা আছে। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।
 
তবে, গোপনে যা বললেন, তা শুনে আমাদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
 
সিলেট হাইটেক পার্কের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া। যার স্বাক্ষর ছাড়া কোনো বিল ছাড়া হতো না। বর্তমানে তিনি সংসদ সচিবালয়ের সচিব। আমরা মুখোমুখি হই তার। যদিও ক্যামেরায় কথা বলতে চাইলেন না।
 
তবে, গোপনে যা বললেন, তা শুনে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
 
সিলেট হাইটেক পার্কের সাবেক পরিচালক গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেন, আমি যদি এখন বলি যে এটি অপরিকল্পিত ছিল, তাহলে তো বিষয়টি আমার বিরুদ্ধেই চলে যাবে। নৌবাহিনী কত টাকা দাবি করেছে, সেটা আপনি জেনে নিন। এখানে অনেক টাকা ঢুকেছে। যারা এই কাজ করিয়েছেন, আপনি তো বোঝেন, এটা ম্যানেজমেন্টই করিয়েছে।
 
হাইটেক পার্ক দুর্নীতির তালিকা শেষ করা কঠিন। তবুও আমরা যেতে চাই আরও কিছু পথ, যেখানে অপেক্ষা করছে আরও অনেক অজানা তথ্য। এবার স্টার নিউজের গন্তব্য রাজশাহীর সিলিকন টাওয়ার।
 
পদ্মাপাড়ের শহর রাজশাহী। নবীনগরে নদীর তীর ঘেঁষা ৩১ একর জমিতে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে সিলিকন টাওয়ার। যেটি উত্তরাঞ্চলের ডিজিটাল স্বপ্নের প্রতীক।
 
২৩৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের খরচ দফায় দফায় বেড়ে বর্তমানে গিয়ে ঠেকেছে ৩৪৩ কোটিতে। তথ্য বলছে, এই ব্যয় বাড়ানো হয় কোনো রকম সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই।
 
রাজশাহী হাইটেক সিটির দুর্নীতি-অর্থ লোপাটের আরও তথ্য মেলে মহাহিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদনে। ২০২১ থেকে ২০২৩, এই দুই অর্থবছরে বিল-ভাউচার ছাড়া খরচ, প্রাপ্যতাবিহীন সম্মানী আর কাজ শেষ না করেই বিল মেটানো মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি।
 
 
অভিযোগ রয়েছে, পার্কের সহকারী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম খোদ প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে মিলে টেন্ডার জালিয়াতি, লেকের মাটি বিক্রি, এমনকি পার্কের সামগ্রী দিয়ে নিজের তিনতলা বাড়িও করেছেন। যে অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও, সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
 
দেখা করতে চাইলে মুখে ডাবল মাস্ক লাগিয়ে আসেন নুরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
 
রাজশাহী হাইটেক পার্কের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ রিউমার আকারে ছড়ানো হয়েছে।
 
বক্তব্য জানতে আমরা মুখোমুখি হই রাজশাহী হাইটেক সিটির প্রকল্প পরিচালক ফজলুর রহমানের। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত। পার্কের বিপুল আর্থিক জালিয়াতির দায় তিনিও নিতে চাননি।
 
রাজশাহী হাইটেক পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, এখানে টেকনিক্যাল লোক এবং কনসালট্যান্স রয়েছে। কাজটি তো আমি একা করিনি। আমরা পুরো বিষয়টি দেখাশোনা করেছি। তাই এটি বেশি দামে কেনার কোনো সুযোগই নেই।
 
কালিয়াকৈরের হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে সিলেট আর রাজশাহীতেও। আলাদা ৩টি প্রকল্প, কিন্তু কৌশল একই। এবং এটা কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে সুসংগঠিত একটি পদ্ধতি। যা প্রতিটি পার্কেই কাজ করেছে একই প্রক্রিয়ায়।
 
হাতে আসা হাইটেক পার্কগুলোর অবকাঠামোগত নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটার তালিকা আর প্রশিক্ষণ প্রকল্পের নথি মিলিয়ে দেখেছে স্টার নিউজ। মূলত ৩টি কৌশলে হয়েছে অর্থ নয়ছয়।
 
প্রথম কৌশলটি ছিল সরঞ্জাম কেনাকাটায় পণ্যের স্পেসিফিকেশন বা বিবরণ অস্পষ্ট রাখা। যাতে যে কোনো মানের পণ্য ইচ্ছেমতো দাম দেখিয়ে কেনা যায় বৈধভাবেই।
 
 
যেমন—রাজশাহী হাইটেক পার্কের জন্য একটা মাস্টার আইপি ফোনের দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, বাজারমূল্যের ৩ গুণ। ৩-৫ হাজার টাকার সাধারণ একটা ডোম ক্যামেরার দাম ৫১ হাজার ৬০০ টাকা। ৫-৬ হাজার টাকা দামের একটি বুলেট ক্যামেরা কেনা হয়েছে ৬৮ হাজার ৯০০ টাকায়। কোর সুইচের দাম ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যেখানে সর্বোচ্চ বাজারদর সাড়ে ৫ লাখ।
 
অর্থ আত্মসাতের দ্বিতীয় কৌশল ছিল, প্রশিক্ষণের নামে বাজেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বাড়ানো। যার অন্যতম উদাহরণ নাটোরের শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার।
 
জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সিংড়া উপজেলায় এই ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। যাতে ঘরে বসেই মিলবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, বদলাবে এই অঞ্চলের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ।
 
অভিযোগ তুলে স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলেন, ঘরে বসে কোটি কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন আমাদের দেখানো হয়েছে। আসলে এগুলো শুধুই আইওয়াশ। এই এলাকার একটি ছেলে বা মেয়েও বলতে পারবে না যে, এখানে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশি অনেক কোম্পানি আসবে বলে আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কিছুই হয় না। আর এখানে যে বিল্ডিংটি দেখছেন, সেটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
 
অভিযোগ রয়েছে, কয়েক বছর কার্যক্রম না থাকার সুযোগে অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে প্রবেশপথেই বাধার মুখে পড়ে স্টার নিউজ।
 
আপনি কি ব্যক্তিগত কাজে এখানকার কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এই প্রকল্পের নিরাপত্তাপ্রহরী বলেন, ‘অবশ্যই পারি।’
 
চলন বিলের ওপর এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের শুরুতেই ছিল অনিয়মের ছড়াছড়ি। পরিকল্পনা বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এই জায়গা নির্ধারণ করা হয়। যার নেপথ্য কারিগর সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।
 
সুজনের নাটোর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক বুলবুল আহমেদ জানান, জুনায়েদ আহমেদ পলকই হাইটেক প্রকল্প নিয়ে আসার পর ওই এলাকার জমি প্রথমে তার আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে কেনানো হয়। এরপর তারাই আবার সেই জমি সরকারের কাছে বিক্রি করেন।
 
গুগল আর্থের তথ্য ঘেঁটেও দেখা যায়, বিলের ১৫ একর জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। যা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল পরিবেশবাদীদের।
 
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, একদিকে যেমন চলনবিলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে চলনবিলের জীববৈচিত্র্যও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে চলনবিল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে এ ধরনের স্থাপনাগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হওয়া উচিত।
 
আইসিটি বিভাগের নিজস্ব তদন্তেই বেরিয়ে আসে, এই একটা প্রকল্পেই ১১০ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে শুধু অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণে। সামগ্রিকভাবে অবস্থানগত ভুল, ভুল নকশা আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ৮টি প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে ৪১৬ কোটি টাকা।
 
হাইটেক পার্ক প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের তৃতীয় কৌশলটি ছিল ভুয়া ডেলিভারি। যে কৌশলে ডটকম সিস্টেমস আর ই-জেনারেশন নামে দুই প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। তারা ৫-১০ ডলার আয়ের ভুয়া ফাইভার স্ক্রিনশট ব্যবহার করে, মূল্যহীন সার্টিফিকেট দেয় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে।
 
হাইটেক পার্কগুলোর অনিয়ম অনুসন্ধানে গঠিত টাস্কফোর্স প্রধান অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহও বলছেন, এমন বেহাল পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বজনপ্রীতির ফল।
 
নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, এটি একটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একদিকে আমরা দেখেছি, ভুয়া ভাউচার দিয়ে ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থের অপচয় হয়েছে। একইভাবে, আমাদের ট্রেইনি ও আইটি খাতের জন্য কর্মশক্তি উৎপাদনের নামে আরেক ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রাজনীতি করা হয়েছে।
 
লুটপাটের কৌশল তো জানা গেল। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই সিস্টেমের নেপথ্য কারিগর কারা? কালিয়াকৈর, সিলেট এবং রাজশাহী ঘুরে বেশ কয়েকটি নাম উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
 
শুরু থেকে হাইটেক পার্কের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, পেশাদারিত্বের পরিবর্তে চলত একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। যার শীর্ষে ছিলেন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। তারই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কাজ করেন সাবেক এমডি বিকর্ণ কুমার ঘোষসহ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্মকর্তারা।
 
আর দ্বিতীয় বলয়ে ছিলেন উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম ও নরোত্তম পাল, সহকারী পরিচালক মাহফুজ কবির এবং উপপরিচালক ও প্রকৌশলী এস এম আল মামুন। আতিক ও নরোত্তম বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত।
 
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তা গেল ১৩ বছরে ডজন খানেকেরও বেশি বার বিদেশ ভ্রমণ করেন, প্রকল্পের অর্থ খরচ করে।
 
তাদেরই একজন মাহফুজ কবির। রাজশাহী ও কালিয়াকৈরে কাজ করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে যশোর হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক।
 
তবে তিনি স্টার নিউজের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
 
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অনিয়মের বড় অংশই ঘটেছে সাবেক এমডি বিকর্ণ কুমার দায়িত্বে থাকা অবস্থায়। তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের কেনাকাটার ব্যাকডেটেড অনুমোদন, উচ্চপদে নিজের শ্যালকসহ অন্তত অর্ধশত কর্মী নিয়োগের অভিযোগ। বিকর্ণ কুমারের মুখোমুখি হয় স্টার নিউজ।
 
‘এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে’—এমন প্রশ্নের জবাবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সাবেক পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষ বলেন, আমার কাছে এমন কিছু মনে হয় না। তবে আমি এখানে বলছি না যে, আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।
 
 
লিফটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনে করেন, আপনাকে এখানে হাইটেক পার্কের এমডি হিসেবে বসানো হলো। একটি প্রকল্প সরকার, প্রধানমন্ত্রী পাস করলেন। সেখানে একটি আইটেমের দাম সাধারণভাবে মনে হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা, কিন্তু ওইখানে লেখা আছে ১ কোটি টাকা। তখন আপনি কী করবেন? তখন কি বলবেন যে, ‘প্রধানমন্ত্রী, আমার কাছে মনে হচ্ছে এখানে অসংগতি আছে, সুতরাং এটা হবে না’?
 
কেন এত অব্যবস্থাপনা এবং কেন এতদিনেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি—এর উত্তর জানতে এবার আমরা হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মুখোমুখি হই।
 
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানান, আমি এখানে আসার পর থেকেই এমডি হিসেবে অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। এখানে কাজ করা আসলে খুবই ডিফিকাল্ট। এখানে যদি একটি স্ট্রং এলিমেন্ট থাকে, তাহলে সেটি ভাঙা আমার জন্য খুবই কঠিন। আমি অত্যন্ত সচেতন হিসেবেই কাজ করছি, যেন আমি নিজে কোনো বিপদে না পড়ি।
 
উদ্যোগ ভালো হলেও হাইটেক পার্কের উদ্দেশ্যই ছিল অর্থ লুটপাট আর রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যম বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
 
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে লুটপাটের একটি মহা উৎসব চলেছে। যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে, যাতে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দেওয়া যায়। এর মূল বিষয় ছিল একদিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, অন্যদিকে ঠিকাদারির সঙ্গে যারা জড়িত এবং আমলাতন্ত্রের একটি অংশ।
 
২০১০ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রার শুরু, কাগজে তা আজও অক্ষত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে আরেক কথা। একটা জাতীয় উদ্যোগ কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বজনপ্রীতির হাতে জিম্মি হয়ে যায়, হাই-টেক পার্ক তারই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
 
এই প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। জনগণের করের হাজার হাজার কোটি টাকার এই অনিয়মের দায় এড়াতে পারে না কেউই। প্রশ্ন হলো, এই অনিয়মের বিচার কি হবে, নাকি উন্নয়নের আড়ালে লুটপাটের এই সংস্কৃতিই হয়ে থাকবে ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিচয়?