পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকল্পের প্রবেশপথে দাঁড়ালেই দেখা মেলে ভিন্ন বাস্তবতার। প্রযুক্তি শিল্পের প্রতীক হওয়ার কথা যে অবকাঠামোর, সেখানেই ভাঙাচোরা রাস্তা। অচল সড়কবাতি, অযত্নে পড়ে থাকা স্থাপনা। চারদিকে যেন বিরাজ করছে গা ছমছমে নীরবতা। স্টার নিউজের উপস্থিতির খবর পৌঁছাতেই শুরু হয় রাস্তা মেরামতের কাজ। প্রশ্ন হলো, এসব কি কেবল রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা?
চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য হলো, ১৮ লাখ টাকা দামের একটি ৫০০ কেভিএ ট্রান্সফরমার বসাতে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া প্রিমিয়াম মডেলের লিফটের দাম যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা; সেখানে পার্কের জন্য কেনা একটি লিফটের বিল করা হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। একটি ব্রিজ নির্মাণে খরচ করা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। কিন্তু এর চুক্তিমূল্য ৬ কোটি টাকা। অর্ধেক টাকাই অন্যের পকেটে।
এই পার্কের ভেতরে দুই তলা দুটি ভবনে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি—তাদের অস্তিত্ব শুধু কাগজেই আছে। এখানেই শেষ নয়। পৌনে দুই কোটি টাকার ভবনে আসবাবও নষ্ট। ভেতরে জমে রয়েছে ময়লার ভাগাড়। ভবনের সামনে ফোয়ারার পানিতে চাষ হচ্ছে মাছ। পার্কে এখন অবাধে চরছে গরু-ছাগল, আর একাধিক জায়গায় ভাঙা সীমানাপ্রাচীর।
ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসাতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ দেখানো হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, যেখানে বাস্তব দর ছিল ২০ হাজার। কালভার্ট ও স্লুইচ গেট নির্মাণেও খরচ হয়েছে প্রাক্কলনের আড়াই গুণ বেশি।
সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এস.এম. আল-মামুন বলেন, আপনি ইলিগাল কথা বললে আপনার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। পিটির বাইরে আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা আছে। মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে।
সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এস.এম. আল-মামুন বলেন, আপনি যদি ইলিগ্যাল কথা বলেন, তাহলে আপনার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। পিটির বাইরে আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা আছে। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।
তবে, গোপনে যা বললেন, তা শুনে আমাদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
সিলেট হাইটেক পার্কের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া। যার স্বাক্ষর ছাড়া কোনো বিল ছাড়া হতো না। বর্তমানে তিনি সংসদ সচিবালয়ের সচিব। আমরা মুখোমুখি হই তার। যদিও ক্যামেরায় কথা বলতে চাইলেন না।
তবে, গোপনে যা বললেন, তা শুনে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
সিলেট হাইটেক পার্কের সাবেক পরিচালক গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেন, আমি যদি এখন বলি যে এটি অপরিকল্পিত ছিল, তাহলে তো বিষয়টি আমার বিরুদ্ধেই চলে যাবে। নৌবাহিনী কত টাকা দাবি করেছে, সেটা আপনি জেনে নিন। এখানে অনেক টাকা ঢুকেছে। যারা এই কাজ করিয়েছেন, আপনি তো বোঝেন, এটা ম্যানেজমেন্টই করিয়েছে।
হাইটেক পার্ক দুর্নীতির তালিকা শেষ করা কঠিন। তবুও আমরা যেতে চাই আরও কিছু পথ, যেখানে অপেক্ষা করছে আরও অনেক অজানা তথ্য। এবার স্টার নিউজের গন্তব্য রাজশাহীর সিলিকন টাওয়ার।
পদ্মাপাড়ের শহর রাজশাহী। নবীনগরে নদীর তীর ঘেঁষা ৩১ একর জমিতে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে সিলিকন টাওয়ার। যেটি উত্তরাঞ্চলের ডিজিটাল স্বপ্নের প্রতীক।
২৩৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের খরচ দফায় দফায় বেড়ে বর্তমানে গিয়ে ঠেকেছে ৩৪৩ কোটিতে। তথ্য বলছে, এই ব্যয় বাড়ানো হয় কোনো রকম সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই।
রাজশাহী হাইটেক সিটির দুর্নীতি-অর্থ লোপাটের আরও তথ্য মেলে মহাহিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদনে। ২০২১ থেকে ২০২৩, এই দুই অর্থবছরে বিল-ভাউচার ছাড়া খরচ, প্রাপ্যতাবিহীন সম্মানী আর কাজ শেষ না করেই বিল মেটানো মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, পার্কের সহকারী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম খোদ প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে মিলে টেন্ডার জালিয়াতি, লেকের মাটি বিক্রি, এমনকি পার্কের সামগ্রী দিয়ে নিজের তিনতলা বাড়িও করেছেন। যে অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও, সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
দেখা করতে চাইলে মুখে ডাবল মাস্ক লাগিয়ে আসেন নুরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ রিউমার আকারে ছড়ানো হয়েছে।
বক্তব্য জানতে আমরা মুখোমুখি হই রাজশাহী হাইটেক সিটির প্রকল্প পরিচালক ফজলুর রহমানের। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত। পার্কের বিপুল আর্থিক জালিয়াতির দায় তিনিও নিতে চাননি।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, এখানে টেকনিক্যাল লোক এবং কনসালট্যান্স রয়েছে। কাজটি তো আমি একা করিনি। আমরা পুরো বিষয়টি দেখাশোনা করেছি। তাই এটি বেশি দামে কেনার কোনো সুযোগই নেই।
কালিয়াকৈরের হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে সিলেট আর রাজশাহীতেও। আলাদা ৩টি প্রকল্প, কিন্তু কৌশল একই। এবং এটা কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে সুসংগঠিত একটি পদ্ধতি। যা প্রতিটি পার্কেই কাজ করেছে একই প্রক্রিয়ায়।
হাতে আসা হাইটেক পার্কগুলোর অবকাঠামোগত নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটার তালিকা আর প্রশিক্ষণ প্রকল্পের নথি মিলিয়ে দেখেছে স্টার নিউজ। মূলত ৩টি কৌশলে হয়েছে অর্থ নয়ছয়।
প্রথম কৌশলটি ছিল সরঞ্জাম কেনাকাটায় পণ্যের স্পেসিফিকেশন বা বিবরণ অস্পষ্ট রাখা। যাতে যে কোনো মানের পণ্য ইচ্ছেমতো দাম দেখিয়ে কেনা যায় বৈধভাবেই।
যেমন—রাজশাহী হাইটেক পার্কের জন্য একটা মাস্টার আইপি ফোনের দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, বাজারমূল্যের ৩ গুণ। ৩-৫ হাজার টাকার সাধারণ একটা ডোম ক্যামেরার দাম ৫১ হাজার ৬০০ টাকা। ৫-৬ হাজার টাকা দামের একটি বুলেট ক্যামেরা কেনা হয়েছে ৬৮ হাজার ৯০০ টাকায়। কোর সুইচের দাম ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যেখানে সর্বোচ্চ বাজারদর সাড়ে ৫ লাখ।
অর্থ আত্মসাতের দ্বিতীয় কৌশল ছিল, প্রশিক্ষণের নামে বাজেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বাড়ানো। যার অন্যতম উদাহরণ নাটোরের শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার।
জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সিংড়া উপজেলায় এই ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। যাতে ঘরে বসেই মিলবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, বদলাবে এই অঞ্চলের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ।
অভিযোগ তুলে স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলেন, ঘরে বসে কোটি কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন আমাদের দেখানো হয়েছে। আসলে এগুলো শুধুই আইওয়াশ। এই এলাকার একটি ছেলে বা মেয়েও বলতে পারবে না যে, এখানে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশি অনেক কোম্পানি আসবে বলে আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কিছুই হয় না। আর এখানে যে বিল্ডিংটি দেখছেন, সেটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েক বছর কার্যক্রম না থাকার সুযোগে অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে প্রবেশপথেই বাধার মুখে পড়ে স্টার নিউজ।
আপনি কি ব্যক্তিগত কাজে এখানকার কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এই প্রকল্পের নিরাপত্তাপ্রহরী বলেন, ‘অবশ্যই পারি।’
চলন বিলের ওপর এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের শুরুতেই ছিল অনিয়মের ছড়াছড়ি। পরিকল্পনা বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এই জায়গা নির্ধারণ করা হয়। যার নেপথ্য কারিগর সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।
সুজনের নাটোর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক বুলবুল আহমেদ জানান, জুনায়েদ আহমেদ পলকই হাইটেক প্রকল্প নিয়ে আসার পর ওই এলাকার জমি প্রথমে তার আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে কেনানো হয়। এরপর তারাই আবার সেই জমি সরকারের কাছে বিক্রি করেন।
গুগল আর্থের তথ্য ঘেঁটেও দেখা যায়, বিলের ১৫ একর জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। যা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল পরিবেশবাদীদের।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, একদিকে যেমন চলনবিলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে চলনবিলের জীববৈচিত্র্যও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে চলনবিল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে এ ধরনের স্থাপনাগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হওয়া উচিত।
আইসিটি বিভাগের নিজস্ব তদন্তেই বেরিয়ে আসে, এই একটা প্রকল্পেই ১১০ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে শুধু অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণে। সামগ্রিকভাবে অবস্থানগত ভুল, ভুল নকশা আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ৮টি প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে ৪১৬ কোটি টাকা।
হাইটেক পার্ক প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের তৃতীয় কৌশলটি ছিল ভুয়া ডেলিভারি। যে কৌশলে ডটকম সিস্টেমস আর ই-জেনারেশন নামে দুই প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। তারা ৫-১০ ডলার আয়ের ভুয়া ফাইভার স্ক্রিনশট ব্যবহার করে, মূল্যহীন সার্টিফিকেট দেয় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে।
হাইটেক পার্কগুলোর অনিয়ম অনুসন্ধানে গঠিত টাস্কফোর্স প্রধান অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহও বলছেন, এমন বেহাল পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বজনপ্রীতির ফল।
নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, এটি একটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একদিকে আমরা দেখেছি, ভুয়া ভাউচার দিয়ে ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থের অপচয় হয়েছে। একইভাবে, আমাদের ট্রেইনি ও আইটি খাতের জন্য কর্মশক্তি উৎপাদনের নামে আরেক ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রাজনীতি করা হয়েছে।
লুটপাটের কৌশল তো জানা গেল। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই সিস্টেমের নেপথ্য কারিগর কারা? কালিয়াকৈর, সিলেট এবং রাজশাহী ঘুরে বেশ কয়েকটি নাম উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
শুরু থেকে হাইটেক পার্কের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, পেশাদারিত্বের পরিবর্তে চলত একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। যার শীর্ষে ছিলেন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। তারই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কাজ করেন সাবেক এমডি বিকর্ণ কুমার ঘোষসহ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্মকর্তারা।
আর দ্বিতীয় বলয়ে ছিলেন উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম ও নরোত্তম পাল, সহকারী পরিচালক মাহফুজ কবির এবং উপপরিচালক ও প্রকৌশলী এস এম আল মামুন। আতিক ও নরোত্তম বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তা গেল ১৩ বছরে ডজন খানেকেরও বেশি বার বিদেশ ভ্রমণ করেন, প্রকল্পের অর্থ খরচ করে।
তাদেরই একজন মাহফুজ কবির। রাজশাহী ও কালিয়াকৈরে কাজ করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে যশোর হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক।
তবে তিনি স্টার নিউজের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অনিয়মের বড় অংশই ঘটেছে সাবেক এমডি বিকর্ণ কুমার দায়িত্বে থাকা অবস্থায়। তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের কেনাকাটার ব্যাকডেটেড অনুমোদন, উচ্চপদে নিজের শ্যালকসহ অন্তত অর্ধশত কর্মী নিয়োগের অভিযোগ। বিকর্ণ কুমারের মুখোমুখি হয় স্টার নিউজ।
‘এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে’—এমন প্রশ্নের জবাবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সাবেক পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষ বলেন, আমার কাছে এমন কিছু মনে হয় না। তবে আমি এখানে বলছি না যে, আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।
লিফটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনে করেন, আপনাকে এখানে হাইটেক পার্কের এমডি হিসেবে বসানো হলো। একটি প্রকল্প সরকার, প্রধানমন্ত্রী পাস করলেন। সেখানে একটি আইটেমের দাম সাধারণভাবে মনে হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা, কিন্তু ওইখানে লেখা আছে ১ কোটি টাকা। তখন আপনি কী করবেন? তখন কি বলবেন যে, ‘প্রধানমন্ত্রী, আমার কাছে মনে হচ্ছে এখানে অসংগতি আছে, সুতরাং এটা হবে না’?
কেন এত অব্যবস্থাপনা এবং কেন এতদিনেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি—এর উত্তর জানতে এবার আমরা হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মুখোমুখি হই।
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানান, আমি এখানে আসার পর থেকেই এমডি হিসেবে অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। এখানে কাজ করা আসলে খুবই ডিফিকাল্ট। এখানে যদি একটি স্ট্রং এলিমেন্ট থাকে, তাহলে সেটি ভাঙা আমার জন্য খুবই কঠিন। আমি অত্যন্ত সচেতন হিসেবেই কাজ করছি, যেন আমি নিজে কোনো বিপদে না পড়ি।
উদ্যোগ ভালো হলেও হাইটেক পার্কের উদ্দেশ্যই ছিল অর্থ লুটপাট আর রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যম বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে লুটপাটের একটি মহা উৎসব চলেছে। যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে, যাতে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দেওয়া যায়। এর মূল বিষয় ছিল একদিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, অন্যদিকে ঠিকাদারির সঙ্গে যারা জড়িত এবং আমলাতন্ত্রের একটি অংশ।
২০১০ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রার শুরু, কাগজে তা আজও অক্ষত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে আরেক কথা। একটা জাতীয় উদ্যোগ কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বজনপ্রীতির হাতে জিম্মি হয়ে যায়, হাই-টেক পার্ক তারই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
এই প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। জনগণের করের হাজার হাজার কোটি টাকার এই অনিয়মের দায় এড়াতে পারে না কেউই। প্রশ্ন হলো, এই অনিয়মের বিচার কি হবে, নাকি উন্নয়নের আড়ালে লুটপাটের এই সংস্কৃতিই হয়ে থাকবে ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিচয়?