Image description

সাতক্ষীরার বাসিন্দা সাইদ উদ্দীন (ছদ্মনাম) অবসরে যাওয়া একজন ব্যবসায়ী। তাঁর বয়স ৬৮। দিনের বড় একটা সময় এখন স্মার্টফোন ব্যবহার করেই কাটে তাঁর। কখনো ফেসবুকে, কখনো ইউটিউবে রিলের পর রিল দেখেন তিনি। কিন্তু এই একই ফোন দিয়ে যে অনলাইন ব্যাংকিং করা যায়, সরকারি সেবা নেওয়া যায়, কিংবা কৃষিতথ্য জানা যায়—সেসব তিনি জানেনও না, ব্যবহারও করেন না।

সাইদ উদ্দীনের মতো মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়। এমন চিত্রই দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির জন্য বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) সর্বশেষ ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে। এতে দেখা গেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ডিজিটাল–দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

চলতি মাসে প্রকাশিত সূচকটিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫৯টি দেশের আইসিটি পরিষেবার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সূচকটি করা হয়েছে।

আইটিইউর বিশ্লেষণ বলছে, যেসব দেশ এগিয়ে গেছে, সেখানে মানুষ শুধু নেটওয়ার্কের আওতায় আসেননি; তাঁরা সেই নেটওয়ার্ককে শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন আর সরকারি সেবায় কাজে লাগিয়েছেন। বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ওপর দাঁড়িয়ে ডিজিটাল অর্থনীতি যতটা বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল, সেই গতি এখনো ধীর।

স্কোর বেড়েছে, তবু পিছিয়ে

আইটিইউর এবারের সূচকে বৈশ্বিক গড় স্কোর ৭৯। আর নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় স্কোর ৬৯। সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮ দশমিক ৯। এক বছর আগে তা ছিল ৬৪ দশমিক ৯। অর্থাৎ এক বছরে ৬ শতাংশ অগ্রগতি, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় লাফ।

তবে এই অগ্রগতির পরও বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, ভুটান, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, এমনকি মিয়ানমারেরও পেছনে।

আইটিইউর সূচক অনুযায়ী, ভিয়েতনামের স্কোর ৮৮ দশমিক ৪, ভুটানের ৮৬ দশমিক ৪, কম্বোডিয়ার ৭৮ দশমিক ৭, শ্রীলঙ্কার ৭৩ দশমিক ২, মিয়ানমারের ৭১ দশমিক ৬।

বাংলাদেশের নিচেই আছে পাকিস্তান, স্কোর ৬৭ দশমিক ৭। আর তালিকার একদম শেষে রয়েছে আফগানিস্তান, স্কোর ৩৬ দশমিক ২।

আইটিইউর বিশ্লেষণ বলছে, যেসব দেশ এগিয়ে গেছে, সেখানে মানুষ শুধু নেটওয়ার্কের আওতায় আসেননি; তাঁরা সেই নেটওয়ার্ককে শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন আর সরকারি সেবায় কাজে লাগিয়েছেন। বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ওপর দাঁড়িয়ে ডিজিটাল অর্থনীতি যতটা বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল, সেই গতি এখনো ধীর।

দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অটোমেশন আর সফটওয়্যারের ব্যবহার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক সূচকে সেই অগ্রগতির প্রতিফলন পুরোপুরি ঘটছে না।
সুমন আহমেদ সাবির, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ

সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। তাঁর মতে, শুধু অবকাঠামো গড়লেই চলবে না; দরকার বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।

সুমন আহমেদ সাবির প্রথম আলোকে বলেন, দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অটোমেশন আর সফটওয়্যারের ব্যবহার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক সূচকে সেই অগ্রগতির প্রতিফলন পুরোপুরি ঘটছে না। একটি দেশের ডিজিটাল সূচক তখনই বাড়ে, যখন মানুষ সেবাগুলো সহজে ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি সেবার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং মানুষের ব্যবহার–দক্ষতার ঘাটতির কারণে প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।

১০ জনে ৫ জনই ইন্টারনেটের বাইরে

গ্রামের হাটবাজারে এখন গেলে খুব কম মানুষই পাওয়া যায়, যাঁর হাতে মুঠোফোন নেই। বেশির ভাগের হাতেই স্মার্টফোন। মোবাইল অপারেটরদের বিজ্ঞাপনও বলছে, দেশের প্রায় পুরো জনসংখ্যাই এখন ফোর–জি নেটওয়ার্কের আওতায়।

আইটিইউর প্রতিবেদন বলছে, দেশের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ থ্রি–জি এবং ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ফোর–জি নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছেন। আর ব্যক্তিগত মুঠোফোন রয়েছে মোট ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের।

তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে উঠে এসেছে নেতিবাচক চিত্র। আইটিইউর হিসাবে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৫ জনই ইন্টারনেটের বাইরে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেটওয়ার্কের আওতা বাড়লেও ‘ইউসেজ গ্যাপ’ তৈরি হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে, লেখাপড়ায়, ব্যবসায় বা আয়ে সেটা এখনো ভালোভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি।

আর বাড়িতে ইন্টারনেট–সুবিধা আছে—এমন পরিবারের হারও ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুই পরিবারের একটিতে এখনো বাসায় বসে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই।

আইটিইউর এই হিসাব অবশ্য ২০২৪ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা।

বিশ্বের গড়ের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধানটা আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্বে গড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। পরিবারপ্রতি ইন্টারনেট–সুবিধার বৈশ্বিক গড় ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ।

‘ইউজেস গ্যাপ’

আইটিইউর প্রতিবেদনে ডিজিটাল অগ্রগতিকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। প্রথমটি হলো ‘অর্থবহ সংযোগ’, অর্থাৎ নেটওয়ার্কের মান কতটা ভালো, গতি কেমন, কভারেজ কতটা। এখানে বাংলাদেশের স্কোর ৮৭ দশমিক ১।

অন্যটি হলো ‘সর্বজনীন সংযোগ’, যেটি বোঝায় কত মানুষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। যেখানে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৫০ দশমিক ৬।

আইটিইউর ডিজিটাল অগ্রগতির সূচকে কোন দেশ কোথায়
আইটিইউর ডিজিটাল অগ্রগতির সূচকে কোন দেশ কোথায়প্রথম আলো গ্রাফিকস

বিশ্লেষকেরা এটাকে বলছেন—‘ইউজেস গ্যাপ’ (ব্যবহারে ফারাক) তৈরি হয়ে গেছে। অবকাঠামো আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে, লেখাপড়ায়, ব্যবসায় বা আয়ে তা এখনো ভালোভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধীরে ধীরে স্কোর বাড়ছে। এটি ভালো লক্ষণ। কিন্তু এখন সময় হয়েছে এই আইসিটি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে অর্থবহ কিছু করতে পারা। অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় করা এবং নাগরিক পরিষেবার মান বাড়িয়ে কীভাবে জীবনযাত্রার মান বাড়ানো যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এখন। শুধু একটি বিশেষ গ্রুপে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সব স্তরের মানুষকে এ অগ্রযাত্রায় যুক্ত করতে হবে।

ধীরে ধীরে স্কোর বাড়ছে। এটি ভালো লক্ষণ। কিন্তু এখন সময় হয়েছে এই আইসিটি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে অর্থবহ কিছু করতে পারা। অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় করা এবং নাগরিক পরিষেবার মান বাড়িয়ে কীভাবে জীবনযাত্রার মান বাড়ানো যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এখন।
অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাবি

উত্তরণে কী উপায়

শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, উত্তরণের পথও দেখিয়েছে আইটিইউ। প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে সর্বজনীন সংযোগ বাড়ানোর দিকে। অর্থাৎ সাইদ উদ্দীনের মতো যাঁরা এখনো নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না, তাঁদের আওতায় আনতে হবে।

পাশাপাশি ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের বিস্তার বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে আইটিইউর প্রতিবেদনে। কারণ, শুধু মোবাইল ইন্টারনেট দিয়ে উচ্চগতির স্থিতিশীল সংযোগের চাহিদা মেটে না। একই সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছে আইটিইউ, যাতে দেশের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করে সঠিক নীতি নেওয়া যায়।