Image description

অনলাইন দুনিয়ায় আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ইতিমধ্যে ফাঁস হয়ে গেছে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় আপনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন—তার ওপরই নির্ভর করছে হ্যাকাররা আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করবে, ফেসবুক-ইমেইল কব্জা করবে, নাকি কোনও ক্ষতি না করেই অন্য লক্ষ্যবস্তুর দিকে চলে যাবে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য ফাঁসের পর অবহেলা না করে দ্রুত কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের বিপদ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

প্রযুক্তি বিশ্বে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ডেটা ব্রিচ বা তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। কোটি কোটি গ্রাহকের ব্যাংক, বিমা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেইস হ্যাক হওয়া এখন নিয়মিত চিত্র। অনেক সময় নিজের কোনো ভুল না থাকলেও থার্ড-পার্টি কোনও প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে আপনার তথ্য ডার্ক ওয়েবে চলে যেতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার করা বা একাধিক অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করার অভ্যাস এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আপনি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন কি না বুঝবেন কীভাবে?

বড় কোনও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটলে সাধারণত তা সংবাদমাধ্যমে আসে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় লিংক বা পোর্টাল তৈরি করে, যেখানে গিয়ে চেক করা যায় আপনার তথ্যটি চুরি হয়েছে কি না। তবে সব হ্যাকিংয়ের খবর গণমাধ্যমে আসে না। আপনার তথ্য চুরি হয়েছে কি না, তা বোঝার কিছু প্রাথমিক লক্ষণ রয়েছে-

ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের রহস্যময় লেনদেন: আপনার অজান্তেই কার্ড থেকে ছোট ছোট অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া। অনেক সময় হ্যাকাররা বড় চুরির আগে কার্ডটি সচল আছে কি না তা দেখতে ছোট কেনাকাটা করে।

অপরিচিত ইমেইল ও স্প্যাম: আপনার ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা থেকে আপনার বন্ধুদের কাছে স্প্যাম মেইল বা জরুরি টাকা চেয়ে বার্তা যেতে পারে। বন্ধুরা যখন আপনাকে ফোন করে জানতে চাইবে আপনি সত্যিই বিপদে পড়েছেন কি না, তখনই বুঝবেন আপনার অ্যাকাউন্ট অন্যের নিয়ন্ত্রণে।

ক্রেডিট স্কোর পরিবর্তন ও নতুন অ্যাকাউন্ট: আপনার অজান্তে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র বা তথ্য ব্যবহার করে কেউ ব্যাংক ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করলে আপনার ক্রেডিট স্কোরে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তথ্য ফাঁসের পর যা করবেন

তথ্য ফাঁসের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কার্যকারী উপায় বাতলে দিয়েছেন-

ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে: কার্ডের তথ্য চুরি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সাথে সাথে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে কার্ডটি ব্লক বা বাতিল করুন। নতুন কার্ড আসার পর যেসব অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে আগের কার্ডের তথ্য ‘সেভ’ করা ছিল, সেগুলো আপডেট করে নিন।

ইমেইল অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার: হ্যাকার যদি আপনার ইমেইলের পাসওয়ার্ড বদলে দেয়, তবে দ্রুত ইমেইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (যেমন জিমেইল বা ইয়াহু) সাহায্য নিন। সবসময় একটি ‘রিকভারি’ বা বিকল্প ইমেইল যুক্ত রাখবেন, তবে দুটি ইমেইলের পাসওয়ার্ড যেন কোনোভাবেই এক না হয়।

পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার: ইমেইল হ্যাক হলে হ্যাকাররা ‘ফরগট পাসওয়ার্ড’ অপশন ব্যবহার করে আপনার ফেসবুক, ইউটিউব বা অনলাইন শপিং অ্যাকাউন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। তাই প্রতিটি ওয়েবসাইটের জন্য ভিন্ন ভিন্ন এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। মনে রাখার সুবিধার্থে ‘কিপার’ বা ‘বিটওয়ার্ডেন’-এর মতো বিশ্বস্ত পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

নিরাপত্তা প্রশ্নের ভুয়া উত্তর দিন: অনেক সাইটে পাসওয়ার্ড রিসেট করার জন্য মায়ের নাম বা প্রথম স্কুলের নাম জানতে চাওয়া হয়। হ্যাকাররা সহজেই এই তথ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খুঁজে বের করে। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় সত্য তথ্য না দিয়ে এমন কোনো ভুয়া নাম বা বাক্য ব্যবহার করুন যা কেবল আপনিই জানেন। যেমন—মায়ের কুমারী নাম কী? উত্তর লিখলেন: ‘আর্জেন্টিনা’।

ভবিষ্যতে সুরক্ষিত থাকতে করণীয়

ডিজিটাল যুগে শতভাগ নিরাপদ থাকা কঠিন, তবে কিছু অভ্যাস আপনাকে হ্যাকারদের সহজ লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে বাঁচাবে-

১. কার্ডের চেয়ে মোবাইল পেমেন্ট নিরাপদ: কেনাকাটায় সরাসরি প্লাস্টিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড সোয়াইপ করার চেয়ে অ্যাপল পে, গুগল পে বা এ ধরনের আধুনিক মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ। এগুলো প্রতি লেনদেনে একটি ইউনিক কোড ব্যবহার করে, ফলে হ্যাকাররা তথ্য চুরি করলেও তা পরবর্তীতে ব্যবহার করতে পারে না।

২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য নয়: যেকোনও ওয়েবসাইটে ফর্ম পূরণের সময় যতটুকু তথ্য না দিলেই নয়, ঠিক ততটুকুই দিন। কোনো কেনাকাটার সাইট যদি আপনার বাসার ঠিকানা চায় (যা হোম ডেলিভারির জন্য প্রয়োজন নেই), তবে সেখানে ভুল বা কাল্পনিক তথ্য দিন।

৩. কাগুজে নথি ধ্বংস করা: ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ইউটিলিটি বিলের কাগজ ডাস্টবিনে ফেলার আগে কুচি কুচি করে কেটে বা পুড়িয়ে ফেলুন। অনেক সময় হ্যাকাররা ময়লার ভাগাড় থেকেও মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে।

জেনে রাখা ভালো, তথ্য ফাঁসের পর হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনও সুযোগ নেই। হ্যাকাররা সবসময় সহজ শিকার খোঁজে। আপনি যদি দ্রুত আপনার পাসওয়ার্ড বদলে নেন এবং অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা জোরদার করেন, তবে হ্যাকাররা আপনার অ্যাকাউন্ট ছেড়ে অন্য কোনও সহজ লক্ষ্যের দিকে চলে যাবে। হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর মাথায় হাত দেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকা ঢের ভালো।

সূত্র: পিসিম্যাগ